এক সময় রূপকথার গল্প শুনিয়ে, ছড়া কেটে শিশুদের খাওয়ানো কিংবা ঘুম পাড়ানো হতো। এখন আর সেই দিন নেই। আজকাল শিশুদের ভোলানো হয় মোবাইলে কার্টুন কিংবা গেমসের মাধ্যমে। ফলে মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়ছে এসব শিশু।

এখন শিশুদের খেলনার তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মোবাইল ফোন। শিশুর বায়না পূরণে মোবাইলে গেমস দেখা বা গান শোনা যেন এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মোবাইল ফোনের বিকিরণের কারণে অন্ধত্বসহ চোখে ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে শিশুদের। বিশেষ করে শহরে খেলাধুলার মাঠের স্বল্পতায় ঘরে আবদ্ধ থাকায় মোবাইলের প্রতি আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অনেক বাবা-মা বাচ্চাদের আবদারে স্মার্ট ফোন কিনে দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, কোমলমতি শিশুদের এই মোবাইল আসক্তি একদিকে যেমন মেধা ধ্বংস করছে, তেমনি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে কর্মস্পৃহা। মাত্রাতিরিক্ত হারে সেলফোন ব্যবহারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ। তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে বাস্তবিক জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি মোহ ও আসক্তি বাড়ছে শিশুদের।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা বুঁদ হয়ে থাকছে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসে।

শুধু এই অতি-আসক্তির কারণে শারীরিকভাবেও শিশুরা নানা সমস্যায় পড়ছে। এমনও অনেক অভিযোগ আসছে যে, শুধু শহরে নয়, এখন গ্রামপর্যায়ে স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের বায়না মেটাতে মা-বাবাকে ধারদেনা করে হলেও কিনে দিতে হচ্ছে দামি মোবাইল সেট।

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। প্রতিদিন এক লাখ ৭৫ হাজার অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের কম। ফেসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়সই ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে।

বাংলাদেশেও ইন্টারনেট প্রসারের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী, যাতে রয়েছে শিশুরাও। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের বিরাট একটা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার বড় একটা অংশই যুক্ত থাকে নানা ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া সাইটের সঙ্গে।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা, চাকরিজীবী আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার বাচ্চার সকালটা শুরু হয় মোবাইল দিয়ে। এটা কোনোভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছি না। মোবাইল না দিলে কিছু খেতে চায় না, কান্নাকাটি করে। তখন বাধ্য হয়ে ফোন দিতে হয়। কী করবো? আসলে বাচ্চারা বাইরে যেতে পারছে না।

ঘরে বসে কীভাবে লম্বা সময় কাটাবে? হয় টিভি দেখে আর তা নাহলে ফোনে গেমস খেলে ওরা সময় কাটায়।’

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র মামান হোসেন জানান, খাওয়ার সময় দেখি, ঘুমানোর সময়ও দেখি।দেখতে খুব ভালো লাগে তাই দেখি। বাসায় বসে মোবাইলে ফেসবুক চালাই বা গেমস খেলি।’

আরিফ হোসেন মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা খাইরুল ইসলাম জানালেন, আরিফের আগের রুটিন নষ্ট হয়েছে। মোবাইলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে বহুগুণ। আগে রুটিনের ভেতরে ছিল। এখন সেটা নেই। এখন রাতে ঘুমায় দেরি করে, সকালে ওঠে দেরি করে। উঠেই মোবাইল খোঁজে। কিছু বললে বলে মোবাইলে পড়ালেখা করবে।

তিনি বলেন, ‘এটা একটা বিরাট সমস্যা। অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় এগুলো মনিটরিংও করতে পারছি না। তাকে মোবাইল রাখতে বললেই উত্তর আসে, তাহলে আমার সঙ্গে খেলো। কিন্তু আমরাও তো সময় দিতে পারছি না।’

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে শিশুদের মোবাইল ফোন আসক্তি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রশ্মি শিশুদের দৃষ্টিশক্তির ভীষণ ক্ষতি করে। যেসব শিশু দৈনিক পাঁচ-ছয় ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমস খেলে, খুব অল্পবয়সে তাদের চোখের সমস্যা হবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যখন মোবাইল ফোনকে সিগারেটের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতি আসক্তির কারণে অনেক বেশি শিশু চক্ষু রোগী পাচ্ছি জানিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ভিট্রিও রেটিনা সোসাইটির সহ-সভাপতি ডা. তারিক রেজা আলী বলেন, চোখের জ্বালাপোড়া, চোখ লাল হওয়া, চোখ পিটপিট করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া এসব অভিযোগই বেশি শিশুদের।

তিনি বলেন, এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে শিশুদের চোখের মাইনাস পাওয়ার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।যাকে বলে মায়োপিয়া। এ রোগে আক্রান্ত শিশুরা কাছের জিনিস ভালো দেখলেও দূরের জিনিস দেখতে পায় না। এ সমস্যা বাড়লে দূরের বস্তু আর দেখবেই না। দূর থেকে আসা যানবাহনও দেখতে পাবে না।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, একটানা কম্পিউটার, মোবাইল বা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে তাকিয়ে থাকাটা বড় ছোট সবার চোখের জন্যই ক্ষতিকর। ছোটোদের বেলায় সেটা আরও বেশি বিপজ্জনক। অভিভাবকদের অনেকে ভাবেন, শিশুদের চোখের সমস্যা বোধহয় কম হয়। এই ধারণা থেকে তারা ওদের চোখ পরীক্ষাও করান না। এসব শিশুর জন্য তখন সমস্যাটা আরও প্রকট হয়।

তিনি জানান, সম্প্রতি শিশুরা চোখ আর মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে বেশি আসছে। এর কারণ, রিফ্লেক্টিভ এরর। অর্থাৎ তাদের চশমার প্রয়োজন হচ্ছে। ’

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version