নিজস্ব প্রতিবেদক: মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের কাছে মাতৃদুগ্ধস্বরূপ। দেশে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাস করা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। বর্তমানে দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্তত ৪০টি ভাষা স্বীকৃত হলেও এর মধ্যে ১৪টি ভাষাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং চর্চা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায়।
বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি মিলনায়তনে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে কর্মশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের সূচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত পরিচালক আবুল কালাম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন- বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি পরিচালক অঞ্জন কুমার চিছাম, নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ সাদাত।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বাঁধন আরেং এবং তর্পন ঘাগ্রা। এছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় শিক্ষক, প্রভাষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
কর্মশালায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ঝুঁকি তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের গবেষণার তথ্যসূত্রে জানানো হয়, স্বীকৃত ৪০টি ভাষার মধ্যে ১৪টি ভাষাকে ইতোমধ্যে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভাষা পরিবারভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ভাষার মধ্যে রয়েছে- ১৫টি চীনা-তিব্বতী ভাষা পরিবার, ১১টি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার, ৯টি অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবার, ৫টি দ্রাবিড় ভাষা পরিবার।
“একটি জাতির আত্মপরিচয় ও প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে থাকে তার ভাষায়। ভাষা হারিয়ে গেলে সেই সংস্কৃতির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। তাই বিপন্ন ভাষাগুলো রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।- কর্মশালার বক্তাবৃন্দ।
আলোচকরা উল্লেখ করেন, সরকার ইতোমধ্যে বিপন্ন ভাষা রক্ষায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যা সমতলের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে চলতি শিক্ষাবর্ষে গারো সম্প্রদায়ের শিশুদের তাদের নিজস্ব ‘আচিক’ ভাষার পাঠ্যপুস্তক এবং হাজং সম্প্রদায়ের শিশুদের তাদের নিজস্ব ভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে। বিলুপ্ত প্রায় ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের পদক্ষেপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বক্তারা মত প্রকাশ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার ধারক-বাহক এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে হবে।


