নিজস্ব প্রতিবেদক: “আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন”- এই আহ্বান এবং “আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান করি: জীবন ও সুস্থতা সুরক্ষায় এগিয়ে আসি” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬।
রবিবার (৯ আগস্ট) উপজেলার নলছাপ্রা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়নমূলক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি অধিকার রক্ষায় পৃথক ভূমি কমিশন গঠনসহ ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
সকালে বর্ণাঢ্য র্যালি, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (টিডব্লিউএ) কলমাকান্দা উপজেলা শাখার চেয়ারম্যান মুকুট স্নালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডিএসকের নির্বাহী পরিচালক ডা. দিবালোক সিংহ। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন বালুচড়া সেক্রেড হার্ট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চারু চার্লস নকরেক।
কারিতাস এনজিও কর্মকর্তা সুজনা রুরাম ও সুজন ম্রংয়ের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কলমাকান্দা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার, ডিএসকে সহকারী পরিচালক শরীয়ত উল্লাহ, উপজেলা সিপিবি সভাপতি কমরেড সিদ্দিকুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিশি কান্তি জাম্বিল, ময়মনসিংহ অঞ্চল কারিতাস আইসিডিপি প্রোগ্রাম অফিসার বুলবুল মানখিন, কলমাকান্দা প্রেসক্লাব সভাপতি শেখ শামীম, বারসিক উপজেলা কো-অর্ডিনেটর গুঞ্জন রেমা, উপজেলা টিডব্লিউএর সেক্রেটারি সুজিত মানখিন এবং বাগাছাসের সেক্রেটারি সুপার কান্তি রিছিল।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি, মাতৃভাষা ও প্রজন্ম পরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যগত জ্ঞান দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। বক্তারা বিশেষ করে আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যগত স্বাস্থ্যজ্ঞান এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রসবকালীন সময়ে ধাত্রীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তাদের অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির আওতায় আনার ওপর জোর দেন।
এ সময় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ সংবিধান সংশোধন করে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানান। তারা বলেন, নিজেদের পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় ১০ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি পাঠ করে শোনান নলছাপ্রা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কপোতী ঘাগ্রা। স্মারকলিপিতে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার রক্ষায় পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, বৈষম্যবিরোধী ও আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, মাতৃভাষায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা, সঠিক জনসংখ্যার নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশ এবং কলমাকান্দায় কালচারাল একাডেমি চালুর দাবি জানানো হয়। আয়োজকেরা জানান, স্মারকলিপিটি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো হবে।
দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে টিডব্লিউএ, প্রতিবন্ধী কমিউনিটি সেন্টার, ডিএসকে, বারসিক বাংলাদেশ, কারিতাস আলোক কোরে-২ প্রকল্প, বাগাছাস, গাসু, বাহাছাসসহ স্থানীয় বিভিন্ন ঋণদান সমিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনা সভা শেষে স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের অংশগ্রহণে নিজস্ব ঐতিহ্য ও জীবনধারার নানা দিক তুলে ধরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।



