স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোরঃ
গত কয়েকদিনের প্রচন্ড দাবদাহে যশোরের জনজীবনে নেমে এসেছিল চরম ভোগান্তি।দাবদাহে অতিষ্ঠ জনগণকে স্বস্তি দিতে আজ সকাল থেকে ভবদহের আকাশ ভারী মেঘে ঢাকা। হয়তো অপূর্ণ আশা নিয়ে বিদায়ের বারতা দেওয়ার জন্য ও জলাবদ্ধ জনগণকে আরও গভীরভাবে জলাবদ্ধ করতে সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টি। মনে হচ্ছে আকাশ, মাটি, নদী-খাল আর ভবদহের পানিবন্দি মানুষ সবাই আজ একসঙ্গে কাঁদছে।
আজ বিদায় নিচ্ছেন মাটি থেকে উঠে আসা গণমানুষের অকৃত্রিম সহযোদ্ধা, চারন কবি, ভূমিপুত্র, স্বশিক্ষিত কমরেড রণজিৎ বাওয়ালি। ভবদহের মানুষ, তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, সহযোদ্ধাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সহযোদ্ধারা যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার নির্ভৃত পল্লীর জলে ডোবা এলাকার ঘর থেকে প্রিয় সহযোদ্ধার দেহ কাঁদতে কাঁদতে শেষকৃত্যের জন্য কাধে করে শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছেন এবং সকলের প্রিয় রণজিৎ দাদাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন। এই বিদায় শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়—এটি ভবদহের জলাবদ্ধতা এলাকার জনগণের সংগ্রামের একজন নিবেদিত সৈনিকের বিদায়।
রণজিৎ বাওয়ালি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই মা-মাটির গন্ধ মাখা সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা মানুষ। কৃষক, শ্রমজীবী ও পানিবন্দি মানুষের জীবন-যন্ত্রণা তিনি নিজের জীবনের অংশ হিসেবে ধারণ করেছিলেন। তিনি শুধু বক্তৃতা বা সভার মানুষ ছিলেন না—গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটেছেন, মানুষের দুয়ারে গিয়েছেন, মানুষকে সংগঠিত করেছেন, সংগ্রামের কথা বলেছেন এবং তাদের কথা গানে-কবিতা-ছন্দে প্রকাশ করেছেন এবং দুঃখী মানুষদের সংগ্রামী হতে উদ্ধুদ্ধ করেছেন।
নদী, পানি, কৃষক, মাটি ও মানুষের দুঃখ নিয়ে তিনি মুহূর্তের মধ্যেই গান তৈরি করতে পারতেন। তাঁর কণ্ঠের সেই গান অনেক সময় হয়ে উঠত জনগণের ক্ষোভের ভাষা, প্রতিবাদের সুর এবং সংগঠিত হওয়ার আহ্বান। এই কারণেই রণজিৎ বাওয়ালির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত শোক নয়—এটি ভবদহের গণসংগ্রামের জন্য এক গভীর শূন্যতা। আজ তাঁকে যখন শেষ বিদায় ও শেষকৃত্যের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন আকাশ থেকে ঝরছে অবিরাম বৃষ্টি। মনে হচ্ছে ভবদহের মাটিও আজ তাঁর জন্য কাঁদছে। যে মাটির মানুষের জন্য তিনি জীবন কাটিয়েছেন, সেই মাটিই আজ তাঁকে বুকের মধ্যে গ্রহণ করবে।
কিন্তু কমরেড রণজিৎ বাওয়ালির জীবন আমাদের শেখায় একজন সংগ্রামী মানুষকে দাহ করে ছাই করে দেওয়া যায়, কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে নয়; তাঁর গানকে নয়; জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নয়। ক্ষমতার মানুষেরা যদি মনে করে একজন রণজিৎ চলে গেলে ভবদহের মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে—তারা ভুল করে। কারণ রণজিৎ একা কোনো নাম নয়; রণজিৎ একটি সংগ্রামী চেতনার নাম। তাঁর রেখে যাওয়া পথ ধরে ভবদহের কৃষক-জনগণ আরও সংগঠিত হবে।
তাঁর গাওয়া গান নতুন কণ্ঠে ফিরে আসবে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাবে। কমরেড রণজিৎ বাওয়ালি, আপনি আজ আমাদের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন,কিন্তু ভবদহের মাটি, পানি, কৃষক ও সংগ্রামী মানুষের হৃদয় থেকে কখনো হারিয়ে যাবেন না।
আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা শুধু ফুলে নয়— জনগণের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারে। বৃষ্টি পড়ুক!মাটি ভিজুক!জলাবদ্ধ হোক ২৭ বিলের শতাধিক গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং তাদের চোখের জল মিশে যাক ভবদহের পানিতে। আপনার সংগ্রামের স্মৃতি ভবদহের জলাবদ্ধ এলাকার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে লাল পতাকার মতো জ্বলতে থাকবে।