নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার মদন উপজেলায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ‘মিড-ডে মিল’ প্রকল্পে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিতে দেওয়া এই খাবারে সরবরাহ করা হচ্ছে পচা ডিম, কাঁচা কলা ও মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের রুটি। দিনের পর দিন এমন অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও নির্বিকার প্রশাসন। বারবার লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে মদন উপজেলায় গত ২৯শে মার্চ থেকে মিড-ডে মিল প্রকল্প চালু হয়। উপজেলার ৯৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১১ হাজার ৮০০ জন শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিদিন রোস্টার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে রুটি, ডিম, দুধ ও কলা বিতরণ করার কথা। সরবরাহের দায়িত্ব পায় ‘সমতা ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প শুরুর পর থেকেই তাদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের বিস্তর অভিযোগ উঠতে শুরু করে।
রবিবার (১৯ জুলাই) উপজেলার শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণের জন্য আনা রুটিগুলো ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ডিমগুলোর অধিকাংশই ছিল পচা।
অস্বাস্থ্যকর এই খাবারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী পায়েল এবং চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী অজুফা আক্তার ও স্বপ্না আক্তার বলে, “আমাদেরকে পচা ডিম, কাঁচা কলা ও মেয়াদোত্তীর্ণ রুটি দেওয়া হয়। এসব পচা খাবার খেয়ে আমাদের অনেক সহপাঠী শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পেটে ব্যথা ও বমির কারণে অনেকে স্কুলেও আসতে পারে না।”
শিক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে না পড়ে, সে বিষয়ে শিক্ষকরা সতর্ক থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্যে তারা অনেকটাই অসহায়। শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মানিক মিয়া জানান, গত বৃহস্পতিবারও তাদের বিদ্যালয়ে পচা ডিম সরবরাহ করা হয়েছিল। বাধ্য হয়ে তারা ৩৫টি পচা ডিম ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন। প্রমাণস্বরূপ এর ভিডিও চিত্রও তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহীন সুলতানা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “বাচ্চাদের এমন খাবার দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সমতা ট্রেডার্স’ এর পরিচালক মাহবুব নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমরা তো নিজেরা এসব খাবার সরাসরি দেই না, অন্যদের (সাব-কন্ট্রাক্টর) মাধ্যমে সরবরাহ করে থাকি। যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তাহলে আমাদেরকে ভিডিও প্রমাণ দিন, আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা সুলতানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিটিং করেছি এবং সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান বা সিদ্ধান্ত আসেনি।”
সরকারের এমন মহৎ উদ্যোগ কতিপয় অসাধু ঠিকাদারের কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং প্রকল্পের স্বচ্ছতা ফেরাতে অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন সচেতন মহল ও অভিভাবকরা।



