উবায়দুল্লাহ রুমি, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:

জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করছে নয় বছর বয়সী মুফিদুল্লাহ। অন্য শিশুদের মতো বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ থাকলেও হাঁটতে না পারায় প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসা ছিল তার জন্য এক কঠিন সংগ্রাম। অভাবের সংসারে একটি হুইল চেয়ার কেনার সামর্থ্যও ছিল না পরিবারের। ফলে প্রতিদিন বাবা কিংবা মা কোলে করে তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন। আবার ক্লাস শেষে কোলে করেই বাড়ি ফিরিয়ে আনতেন।

তবে একটি হুইল চেয়ার যেন বদলে দিয়েছে তার শিক্ষাজীবনের পুরো গল্প। বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থী মুফিদুল্লাহর হাতে একটি হুইল চেয়ার তুলে দেওয়া হয়। হুইল চেয়ারটি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা এই শিক্ষার্থী এখন নিজেই বিদ্যালয়ে যাওয়া আসার স্বপ্ন দেখছে। মুফিদুল্লাহ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের তারাটি গ্রামের আব্দুস সালাম ও ফরিদা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। সে ৮১ নম্বর তারাটি নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তার চলাফেরা সীমিত হলেও লেখাপড়ার প্রতি রয়েছে প্রবল আগ্রহ। কিন্তু প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছানো ছিল পরিবারের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকালে মা অথবা বাবা নিজেদের কাজকর্ম ফেলে ছেলেকে কোলে করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতেন। আবার বিদ্যালয় ছুটির পর নিয়ে আসতেন বাড়িতে।

আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেও একটি হুইল চেয়ার কিনতে পারেননি তারা। ফলে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে তাদেরকে প্রতিনিয়ত কষ্ট করতে হয়েছে। হুইল চেয়ার হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মুফিদুল্লাহ বলে, স্কুলে যেতে আমার অনেক কষ্ট হতো। আব্বা আম্মা আমাকে কোলে করে নিয়ে যেতেন। এখন আমি নিজেই হুইল চেয়ারে করে স্কুলে যেতে পারব। খুব ভালো লাগছে। আমি অনেক খুশি। মুফিদুল্লাহর মা ফরিদা বেগম বলেন, ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই হাঁটতে পারে না। প্রতিদিন তাকে স্কুলে নেওয়া আনা করতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো।

সংসারের অভাবের কারণে একটি হুইল চেয়ার কিনে দেওয়ারও সামর্থ্য ছিল না। আজ ছেলেটি হুইল চেয়ার পেয়েছে। এতে তার যেমন সুবিধা হবে, আমাদের কষ্টও অনেক কমে যাবে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি প্রকল্পের আওতায় শুধু মুফিদুল্লাহ নয় উপজেলার আরও চারজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝেও হুইল চেয়ার বিতরণ করা হয়েছে। এই সহায়তার ফলে তারা আরও সহজে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবে এবং নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিতে সক্ষম হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ আহমেদ বলেন, কোনো শিশুর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যেন তার শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সেই লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি হুইল চেয়ারের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক আমরা তা চাই না। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হুইল চেয়ার বিতরণ করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রহমান।

এ সময় মগটুলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিহাব উদ্দিন আকন্দ, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রহমান বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধরনের সহায়তা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত থাকতে সহায়তা করবে। একটি হুইল চেয়ার হয়তো অনেকের কাছে সাধারণ একটি উপকরণ। কিন্তু মুফিদুল্লাহর জন্য এটি শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়; এটি তার স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী, আত্মনির্ভরতার প্রতীক এবং শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা। ছোট্ট এই সহায়তা যেন তার জীবনে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার আলো।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version