নিজস্ব প্রতিবেদক: জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘এগ্রোইকোলজি’ বা কৃষি-পরিবেশবিদ্যাই দেখাচ্ছে নতুন পথ। স্থানীয় জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কৃষকের নিয়ন্ত্রণভিত্তিক কম খরচের কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত হলো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংলাপ।
বুধবার (১০ জুন) নেত্রকোনা সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে “বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল খাদ্য ব্যবস্থা বিষয়ক আঞ্চলিক সংলাপ: এগ্রোইকোলজি দেখাচ্ছে নতুন পথ” শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’। রোজা লাক্সেমবার্গ স্টিফটুং সাউথ এশিয়া’র সহযোগিতায় আয়োজিত সংলাপে কৃষক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সংলাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল বাকিউল বারী। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে নদী, হাওর, বনসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। সবাইকে সাথে নিয়ে এই সম্পদ রক্ষা করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে। নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়া একটি জাতি কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না।”
এ সময় তিনি উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও উন্মুক্ত স্থান নষ্ট হওয়ার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিএফআরআই এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বারসিকের পরিচালক সিলভানুস লামিন। এরপর কৃষিপ্রতিবেশ সংকট ও সম্ভাবনার ওপর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রেজেন্টেশন দেন পলিসি এন্ড রিসার্চ অফিসার আমরীন বিনতে আজাদ।
উন্মুক্ত আলোচনায় পরিবেশবিদ ও আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল কবীর সরকারের বক্তব্যে বর্তমান কৃষিব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “সঠিক নির্দেশনার অভাবে কৃষকরা মাত্রারিক্ত বিষ প্রয়োগ করছেন, এমনকি বাজারজাত করার আগেও আমে কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার, গোবরের অভাবে জৈব সারের ঘাটতি এবং হাওরে ইজারাদারদের বিষপ্রয়োগের ফলে চরম পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।”
সংকট উত্তরণে তিনি হাওরের ইজারা প্রথা বাতিল করে সেগুলোকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা এবং রোগবালাই ঠেকাতে একমুখী ধান চাষের বদলে পুনরায় শস্যাবর্তনের (পর্যায়ক্রমে পাট, ধান, ডাল, সরিষা ইত্যাদি চাষ) তাগিদ দেন।
সংলাপে কৃষাণ গবেষক গোলাম মোস্তাফা কৃষিতে বিষের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি নারী কৃষকদের অবমূল্যায়নের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি কৃষিনীতিতে নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দের জোর দাবি জানান।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “উন্নয়নের নামে প্রাণপ্রতিবেশ বিনষ্ট করা হচ্ছে। হাওর ও পাহাড়কে তার প্রাকৃতিক অবস্থায় থাকতে দিতে হবে।”
সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গ্রিন কোয়ালিশন কমিটির মির্জা হৃদয় সাগর, তানভীর হায়াত খান, গবেষক ও লেখক আলী আহমদ খান আইয়ুব, অধ্যক্ষ আনোয়ার হাসান, কৃষক এনামুল হক প্রমুখ।
আলোচনা শেষে জলবায়ু সহনশীল, কৃষকবান্ধব ও টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জোর আহ্বান জানিয়ে সময়োপযোগী এই সংলাপের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।



