দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা যাচাইয়ে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক।

আজ রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি কৌশলগত স্তরে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে উভয় দেশের যৌথ অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে বন্ধুভাবাপন্ন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

তিনি বলেন, আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের দ্বারা পরিচালিত। এই নীতিটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণে আমাদের সুদৃঢ় অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। একই সাথে, এটি আমাদের এই বিশ্বাসকেও ধারণ করে যে সীমান্তের বাইরে আমাদের বন্ধু ও অংশীদার রয়েছে, কোনো প্রভু নয়।

উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছে যে, এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং এটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

এই আলোচনার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ। ড. খলিলুর রহমান জানান, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও গতিশীল করতে বাংলাদেশ ও তুরস্ক একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।

ড. খলিলুর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করেন, হাকান ফিদানের এই সফর দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা, যৌথ প্রয়াস এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও গভীর করবে এবং বিভিন্ন খাতে অংশীদারিত্বের নতুন নতুন সুযোগ উন্মোচনে সহায়তা করবে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনচিকে পাঠানোর জন্য তুরস্কের প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থন দেওয়ায় তুরস্কের সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে হাকান ফিদানকে ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে তার দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন।

ফিদান বলেন, বেশ কয়েকটি খাতে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিতে সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশকে ‘গ্লোবাল সাউথের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর’ হিসেবে অভিহিত করে ফিদান বলেন, উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে মতামত ব্যক্ত করেছে এবং এর অনেকগুলোতেই অভিন্ন ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

ফিদান বলেন, তুরস্ক পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবে। তিনি বন্ধুভাবাপন্ন এই দুই দেশের যৌথ আকাক্সক্ষার সাথে সঙ্গতি রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আঙ্কারার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানবিক কারণে ১০ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য আঙ্কারার অব্যাহত সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি ঐতিহাসিক মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। আমরা এর প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত মূল্যায়ন করি এবং রোহিঙ্গা জনগণের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।

ফিদান জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় টিকিয়ে রাখতে তুরস্ক নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করবে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গাজা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলমান নৃশংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, তুরস্ক আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে কূটনীতি ও সংলাপের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনার বিষয়ে ফিদান আশা প্রকাশ করেন , এই আলোচনা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে। তিনি নৌপথে কৌশলগত নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন এবং উত্তেজনা প্রশমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় থাকা পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত উপস্থিত ছিলেন।

দুই দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা পৌঁছান হাকান ফিদান। এ সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।

আজ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তিনি রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার যান। এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশে মানবিক প্রচেষ্টার প্রতি তুরস্কের অব্যাহত সহযোগিতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version