নিজস্ব প্রতিবেদক: “আমাকে আপনারা দয়া করে গতানুগতিক ধারার কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা এমপি হিসেবে দেখবেন না। আমি শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা বা দালানকোঠা নির্মাণ করে উন্নয়নের প্রমাণ দিতে চাই না। আমি চাই আমাদের এ অঞ্চলের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিক উন্নয়ন।”
রবিবার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নবনিযুক্ত ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
উপজেলা প্রশাসন, দুর্গাপুরর উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি (বিরিশিরি) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে এবতেদায়ী ৫ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি/সমমান জুনিয়র বৃত্তিপ্রাপ্ত এবং এসএসসি/সমমান-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আহমেদ সাদাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার পরামর্শ দিয়ে ডেপুটি স্পিকার নারী শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “আজকে সাধারণ শাখায় ২৮ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জনই হচ্ছে আমাদের সুমেশ্বরী কন্যা (নারী শিক্ষার্থী)। আমি স্বপ্ন দেখি, আজকের বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামী দিনে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা থেকেই কেউ একজন এমন পদে আসীন হবে।”
গত ২১ আগস্ট জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার সময় আমি কল্পনা করছিলাম এবং প্রত্যাশা করছিলাম, আগামী দিনে কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের কোনো সন্তান যেন রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে শপথ বাক্য পাঠ করে। অভিভাবক হিসেবে আমি সেই স্বপ্নের জায়গাটা বাড়িয়ে দিয়েছি।”
বক্তব্যের একপর্যায়ে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, “উন্নয়ন বলতে আমি শুধু অট্টালিকা বুঝি না। আমি কাগজ উল্টে দেখছিলাম, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এলাকার তিনটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে। এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো সরকারি স্কুলের মতোই সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে তাদের ফলাফল কেন এত খারাপ হবে?”
ঐতিহাসিক পাইলট স্কুল এবং গুজিরকোনা হাইস্কুল ও বালিকা বিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “গুজিরকোনার মতো এলাকায় ছেলেদের স্কুল থেকে মাত্র একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, আর মেয়েদের স্কুল থেকে কেউ পায়নি। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। আপনারা আমার কাছে তিনতলা-চারতলা বিল্ডিং চান। আমি হয়তো চারতলা ভবন দিতাম, এখন আমাকে পুনরায় ভাবতে হচ্ছে। কারণ অট্টালিকা দিয়ে কী হবে, যদি সেখান থেকে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বা ভালো শিক্ষার্থীই বের করতে না পারি!”
স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকদের সাথে কথা বলে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের জন্য তিনি উপস্থিত ইউএনও এবং শিক্ষা কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দুর্গাপুরের পাইলট স্কুল ও পিসিনল স্কুলের কারিগরি শাখার ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় স্কুলগুলোকে নিজেদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “শিক্ষক সবার জন্যই শিক্ষক। দয়া করে বাচ্চাদের একটু ভালোভাবে পড়ানোর চেষ্টা করুন। শুধু পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তাদের মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করুন।”
এ সময় তিনি জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ টেনে বলেন, “জাপানে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরীক্ষা নেওয়া হয় না। সেখানে আগে বাচ্চাদের মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তোলা হয়। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।”
কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ আমরা বিএ, এমএ পাস করে বেকার থাকি, টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজ থেকে পাস করে কেউ বেকার থাকে না।”
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মানবতা ও সততার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “আমরা যে যত বড়ই হই না কেন, প্রত্যেকেই কিন্তু মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা যদি আমাদের কর্মের মাধ্যমে নিজেদের কাছে আত্মতৃপ্তি না পাই, তাহলে মানুষ হওয়ার কোনো সার্থকতা নেই। সততা ও একাগ্রতার সাথে কাজ করলেই কেবল এই আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সার্টিফিকেট ও সম্মাননা ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়। এর পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার তার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক লিও টলস্টয় রচিত ‘How Much Land Does a Man Need?’ (একজন মানুষের কী পরিমাণ জমি প্রয়োজন?) শীর্ষক ইংরেজি বইটি উপহার দেন।
অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বইটির সব অর্থ হয়তো একবারে বোঝা সম্ভব নয়, ডিকশনারি পাশে নিয়ে বইটি পড়বে। তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার ক্ষেত্রে এই বইটি অনেক কাজে লাগবে।”
দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় এবং উপস্থিত সবার ক্ষুধার কথা বিবেচনা করে তিনি তার বক্তব্য দীর্ঘ না করে এবং দেরিতে অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য শেষ করেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, কৃতি শিক্ষার্থী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



