শেখ শামীম: সীমান্ত মানেই শুধু কাঁটাতারের বিভাজন নয়; বরং সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা হয়ে উঠতে পারে উন্নয়ন, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের নতুন এক দিগন্ত। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নে প্রস্তাবিত ‘রামনাথপুর-মহেষখোলা স্থলবন্দর’ তেমনই এক অপার সম্ভাবনার নাম। তবে দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছরের প্রতীক্ষা শেষে প্রকল্পটি এখনো প্রশাসনিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আটকে আছে।

সম্ভাবনাময় এ সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্রটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য এখন জোরালো হচ্ছে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দাবি।

প্রকল্পটির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০০২ সালে প্রথম ‘রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক (অভ্যন্তরীণ) ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ এর উদ্যোগে এখানে একটি স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সীমান্ত পিলার ১১৮৬/৫-এস ও ১১৮৬/৬-এস সংলগ্ন এলাকায় ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

দীর্ঘ সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তর বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার পর্যালোচনা করেছে। মাঠ পর্যায়ের তদন্তেও এই প্রকল্পের ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের অভাবে কাজটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

স্থলবন্দর স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত ও অবকাঠামোগত সম্ভাবনা রামনাথপুরে বিদ্যমান। উপজেলা সদর থেকে রামনাথপুর পর্যন্ত রয়েছে আংশিক পাকা সড়ক। এছাড়া নদীপথ ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ২৮ একর জমি নিয়ে ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দৃঢ় দাবি, সরকার প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিলে তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নেই যাবতীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রস্তুত।

স্থলবন্দরটি চালু হলে দুই দেশের মধ্যে বৈধ বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। ব্যবসায়ীদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বন্দর থেকে বছরে প্রায় একশো কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব। নেত্রকোনা জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আলহাজ্ব সোহরাব উদ্দিন আকন্দ (খায়রুল) জানান, এই বন্দর চালু হলে যেসকল পণ্য আমদানি-রপ্তানি হবে তার একটি পরিষ্কার চিত্র হলো- ভারতের মহেষখোলা এলাকায় থাকা বিপুল খনিজ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে মূলত কয়লা, চুনাপাথর, পাথর, বালু, কাঠসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ থেকে খাদ্যপণ্য, মাছ, গার্মেন্টস সামগ্রী, পাট, চামড়া, প্লাস্টিক, সিরামিক এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্য ভারতে রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে যৌথ বিনিয়োগ ও নতুন শিল্প স্থাপনের পথও প্রশস্ত হবে। এছাড়া সাপ্তাহিক ‘মৈত্রী বাজার’ চালু করা গেলে দুই দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী, পর্যটক ও সীমান্তবর্তী মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হলে পিছিয়ে পড়া সীমান্ত অঞ্চলে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ নানা খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি, বৈধ বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে চোরাচালান ও অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

স্থলবন্দর নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। রামনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা মতিশ ম্রং (বাসিন্দা, জানান, “স্থলবন্দর হলে আমাদের এলাকায় কাজের সুযোগ বাড়বে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।”

রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন প্রয়োজন দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।”

রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল বলেন, “এই স্থলবন্দর বাস্তবায়ন হলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।”

কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম জানান, “বৈধ বাণিজ্য বাড়লে সরকার পাবে রাজস্ব, মানুষ পাবে কর্মসংস্থান- এটি একটি টেকসই উন্নয়ন মডেল হতে পারে।”

দীর্ঘদিনের এ উদ্যোগটি মূলত প্রশাসনিক কিছু ধাপে আটকে আছে। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন পর্যায়ের প্রতিবেদন ও সমন্বয় প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজতর হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। কলমাকান্দার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. মিকাইল ইসলাম জানিয়েছেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।”

অন্যদিকে, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান আশ্বস্ত করে বলেন, “সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

সচেতন মহলের মতে, বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক প্রেক্ষাপটে রামনাথপুর স্থলবন্দরটি ‘উইন-উইন’ (Win-Win) বা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক প্রকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রতীক্ষিত প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের যুগান্তকারী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল একটি সময়োপযোগী ও দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই পারে সীমান্তের বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে- যা অর্থনীতিকে করবে শক্তিশালী এবং উন্মোচন করবে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version