শেখ শামীম: টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলায় নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রধান কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় আকস্মিক আগাম বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের মুখে হাওরের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান রক্ষায় কৃষকেরা এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক প্রাণান্তকর লড়াই চালাচ্ছেন।

কলমাকান্দা উপজেলার প্রধান নদী উব্দাখালীসহ মহাদেও, গনেশ্বরী ও মঙ্গেলশ্বী এবং দুর্গাপুরের কংশ নদীর পানি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বুধবার (২৯ এপ্রিল) সর্বশেষ তথ্যমতে, পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে।

এদিন, বিকেল ৩টার দিকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, উব্দাখালী নদী (কলমাকান্দা) পানি বিপৎসীমার (৪.৯০ মিটার) ০.৬০ মিটার ওপর দিয়ে অর্থাৎ ৫.৫০ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে। দুর্গাপুরে কংশ নদীর জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার (৬.৩৫ মিটার) ০.৯৩ মিটার ওপর দিয়ে অর্থাৎ ৭.২৮ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে এবং খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদী পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিকেল ৩টায় পানি ৩.৯১ মিটারে অবস্থান করছিল, যা বিপৎসীমার (৪.১৫ মিটার) মাত্র ০.২৪ মিটার নিচে রয়েছে।

একই দিন দুপুর ২টার দিকে উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ১.০৫ মিটার নিচে থাকলেও মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকেল ৩টায় তা বিপৎসীমার ওপরে চলে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় কলমাকান্দার মেদী, তেলেঙ্গাসহ কয়েকটি বিলের পাকা ধান ইতোমধ্যেই তলিয়ে গেছে। কৃষকদের দাবি, হাওরের প্রায় ৫০ শতাংশ বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও অন্তত ২০ শতাংশ জমির ধান মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ফসল বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক কাঁচাপাকা অবস্থাতেই ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।

সোনাডুবি হাওরপারের মন্তলা গ্রামের কৃষক আবুল মিয়া নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, “বৃষ্টি, বাড়তি পানি আর বজ্রপাত- সব মিলিয়ে হাওরে যেতে ভয় লাগে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। বৃষ্টি এবং রোদ না থাকার কারণে কেটে আনা ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না, যা কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ”

কলমাকান্দা উপজেলার কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কলমাকান্দায় ২১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে চার হাজার ৬৩০ হেক্টর জমি। সরকারি হিসেবে প্রায় এক হাজার ছয়শো হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যেই পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কলমাকান্দার কৃষি বিভাগের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৪৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তবে কাটা হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। উপজেলায় ৫৫টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার বরাদ্দ থাকলেও হাওরে পানি জমে থাকায় অনেক জায়গায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ৩০-৩৫টি হারভেস্টার কাজ করছে। এর ওপর জ্বালানি সংকটের কারণে এই যন্ত্রগুলোর কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কলমাকান্দার কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “কয়েকটি হাওর ও বিলে পানি ঢুকেছে। প্রায় এক হাজার ছয়শো হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি এবং মাঠে সমন্বয় করছি, তবে শ্রমিক সংকট বড় চ্যালেঞ্জ।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. মিকাইল ইসলাম প্রশাসনের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বলেন, “হাওরের ধান কাটা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দ্রুত ধান কাটা শেষ করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।”

হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন চলছে এক অদৃশ্য দৌড়। একদিকে হু হু করে বাড়তে থাকা বানের পানি, অন্যদিকে কৃষকের সারা বছরের অন্ন সংস্থানের লড়াই। সময়মতো বোরা ধান ঘরে তুলতে না পারলে কৃষকের সারা বছরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম পানিতে ভেসে যাওয়ার শঙ্কা ক্রমেই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version