নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হবে, মসৃণ পথে যাতায়াত করা যাবে- এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার এলাকাবাসী। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে শুরুও হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কার কাজ। সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে চরম হতাশায়। কাজ শেষ হওয়ার পাঁচ দিন না যেতেই হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ (কার্পেটিং)! এমন পুকুরচুরির ঘটনায় ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয়রা।

শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরের দিকে সরেজমিনে দুর্গাপুর ইউনিয়নের চারিয়া মাসকান্দা থেকে মাকড়াইল বাজার পর্যন্ত নির্মিতব্য সড়কে গিয়ে দেখা যায় চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের চিত্র। পিচ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচদিনের মাথায় রাস্তা থেকে হাত দিয়েই অনায়াসে তুলে ফেলা যাচ্ছে পিচ। যেন মাটির ওপর শুধু নামমাত্র প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

কৃষকদের উৎপাদিত ফসল পরিবহন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির এমন করুণ দশা দেখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলেছেন- এর দায়ভার কার?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক কোটি ৩৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কারের কাজটি বাস্তবায়ন করছে ‘মেসার্স তাজ উদ্দিন ফরাস’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের আগস্ট মাসে কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কাজ চলাকালীন সময়েই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রাইম কোট বা পরিমাণমতো বিটুমিন (আলকাতরা জাতীয় তরল) ব্যবহার না করেই যেনতেনভাবে পিচ ঢালাই করে চলে যায় ঠিকাদারের লোকজন। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এলাকায় তাদের কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি।

নিম্নমানের কাজ দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলাম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‍“এই রাস্তা দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, হাটবাজারসহ সব জায়গায় আমাদের যাতায়াত করতে হয়। আমরা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিলাম। কাজ শুরু হওয়ায় খুব খুশি হয়েছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। মাত্র পাঁচ দিন হলো পিচ ঢালাই করা হয়েছে, কিন্ত এখন হাতে টান দিলেই পিচ উঠে যাচ্ছে।”

তাজ্জত আলী নামের আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, “সড়কে বিটুমিন না দিয়েই ঢালাই করে দেওয়া হয়েছে। আমি এমন অনিয়ম দেখে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু ঠিকাদারের লোকজন আমার কথা শোনেননি। উল্টো তারা আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন।”

আব্দুল হামিদ নামের প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভের সঙ্গে এই কাজকে ‘ছেপ দিয়া লেপ দিছে’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন রাস্তা চাই নাই। আগে কাদা ভেঙে হেঁটে চলতে হইছে, এখন এই রাস্তা যেভাবে করা হচ্ছে, তাতে এক মাসও টিকবে না।”

চারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হক বলেন, “আমাদের এই রাস্তা দিয়ে অনেক কষ্ট করে চলাচল করতে হয়েছে। রাস্তা তো আর বারবার তৈরি করা হবে না। যে অবস্থায় রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে অল্পদিনের মাঝেই এটি নষ্ট হয়ে যাবে। সরকার কোটি টাকা ব্যয় করছে, অথচ কাজের মান যদি এমন হয় তবে তা শুধু সরকারি টাকার অপচয় হওয়া ছাড়া আর কিছুই না।”

বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “কার্পেটিং কাজের শুরুর পরদিনই সমস্যা নজরে আসায় আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে, যা যা প্রয়োজনীয় তা ব্যবহার করে সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করতে হবে।”

সার্বিক বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা আফসানা বলেন, “রাস্তার কাজে অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে ইতিমধ্যে প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কড়া নজরদারি থাকবে। কোনোভাবেই ঠিকাদারকে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

স্থানীয়দের দাবি, শুধু কাজ বন্ধ রাখলেই হবে না, ইতিমধ্যে যে নিম্নমানের কাজ হয়েছে তা তুলে ফেলে পুনরায় সঠিক নিয়মে এবং উন্নত সামগ্রী ব্যবহার করে টেকসই সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version