নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ সড়কে চলাচলকারী বিআরটিসি ডাবল ডেকার বাসে যাত্রী হয়রানি, স্টুডেন্ট পাস বাতিল করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে ফুঁসছে নেত্রকোনার সাধারণ যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা। এসব অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন বিআরটিসি ময়মনসিংহ ডিপোর ম্যানেজার এনামুল হক। তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টায় নেত্রকোনা পৌরশহরের বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডের সামনের সড়কে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
‘সচেতন নাগরিক ও ছাত্র সমাজ’ এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতৃবৃন্দ, সাধারণ শিক্ষার্থী, ভুক্তভোগী যাত্রী এবং বাসের সাবেক কর্মীরা। মানববন্ধনে বক্তারা ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, বাসের যন্ত্রাংশ চুরি, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মম জানান, তিনি নিয়মিত শ্যামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনায় যাতায়াত করেন। বাসের হেলপার ও সুপারভাইজাররা শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত বাজে ব্যবহার করে এবং হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আরেক শিক্ষার্থী নাফিস জানান, বাসের স্টাফদের আচরণ এতটাই খারাপ, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
মানববন্ধনে যাত্রীরা অভিযোগ করেন, গাড়িগুলোর ফিটনেস বলতে এখন আর কিছুই নেই। রাস্তায় চলন্ত অবস্থায় প্রায়শই চাকা ফেটে যায়, সিট ভাঙা, ফ্যান ঘোরে না এবং জানালার গ্লাস না থাকায় বৃষ্টির দিনে যাত্রীদের ভিজে একাকার হতে হয়।
বিআরটিসি বাসের সাবেক সুপারভাইজার মো. রাব্বি জানান, তিনি গাড়ির বেহাল দশা এবং যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা ডিপো ম্যানেজারকে জানালে, ম্যানেজার এনামুল হক তাকে চাকরি থেকে সরাসরি বরখাস্ত করেন। রাব্বি গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, “ম্যানেজার নষ্ট ও পচা চাকা মেরামত করে বাসে লাগান এবং নতুন যন্ত্রাংশের ভুয়া বিল করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন। বাসের পুরনো ফ্যানগুলোও খুলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।”
মানববন্ধনে মামুন নামের এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তারা শুরুতে লিজ নিয়ে বিআরটিসি বাসগুলো এ সড়কে চালু করেছিলেন। কিন্তু নতুন ম্যানেজার এনামুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পরই তাদের কাছে মাসিক চাঁদা এবং মোটা অংকের ঘুষ দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের কাছ থেকে বাসের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয়।
মাশরুর আহমেদ মাহিন নামের আরেক প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থী জানান, ম্যানেজার এনামুল হক এরআগে গোপালগঞ্জ ডিপোতেও ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন এবং সেখানেও তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে সেখান থেকে বদলি হয়ে আসার পরও তিনি তার স্বভাব বদলাননি। তার দুর্নীতির কারণেই বাসগুলোর আজ এমন জরাজীর্ণ অবস্থা।
এ বিষয়ে কথা বলতে ডিপো ম্যানেজার এনামুল হকের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনি ধরায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মানববন্ধন থেকে সাধারণ যাত্রী ও ছাত্র সমাজ অবিলম্বে দুর্নীতিবাজ ডিপো ম্যানেজার এনামুল হককে অপসারণের জোর দাবি জানান। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট পাস ও হাফ ভাড়া পুনর্বহাল না করা হলে আগামীতে নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ সড়কে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। কোনোভাবেই দুর্নীতির মাধ্যমে ছাত্র-জনতার অধিকার খর্ব করতে দেওয়া হবে না বলে জানান তারা।
ম্যানেজার এনামুল হকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ডিপোতে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ভুয়া ভাউচার, পুরাতন যন্ত্রাংশ দিয়ে গাড়ি মেরামত এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি সরকারের কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, এনামুল হকের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল বিশাল কমিশন সিন্ডিকেট। ‘মিজান মটর’ নামক নির্দিষ্ট একটি দোকান থেকে মালামাল কেনা হতো এবং সেখান থেকে মোটা অংকের কমিশন নেওয়া হতো। এই কেনাকাটা থেকে ম্যানেজার এনামুল হক নিজে নিতেন ৩০% কমিশন, টেকনিক্যাল প্রধান মনির হোসেন নিতেন ১০% এবং সহকারী ফোরম্যান জাহিদ হোসেন সজিব নিতেন ৫% ভাগ! টুঙ্গিপাড়া ডিপোতে এমন নজিরবিহীন অনিয়ম, লুটপাট, ট্রিপ লস এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়ার পরেও তাকে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়নি। উল্টো তাকে ময়মনসিংহ বাস ডিপোতে বদলি করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের কাছে দুর্নীতিবাজদের জন্য ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গোপালগঞ্জে দুর্নীতির পাহাড় গড়া এই কর্মকর্তা বর্তমানে ময়মনসিংহে এসেও তার পুরোনো স্বভাব বদলাননি। বর্তমানে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা রুটেও ফিটনেসবিহীন বাস চালানো, শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট পাস বাতিল করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং চরম দুর্ব্যবহারের কারণে ফুঁসছে সাধারণ যাত্রী ও ছাত্র সমাজ।
যার বিরুদ্ধে এত পাহাড়সম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ, তিনি কীভাবে বহাল তবিয়তে পদে আসীন থাকেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপসারণ দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।