Site icon দ্যা মেইল বিডি / খবর সবসময়

বৃদ্ধের নামের পাশে ‘লাল কালি’: জ্যান্ত মানুষ সরকারি খাতায় ‘মৃত’, ভাতা ‘বন্ধ’!

নিজস্ব প্রতিবেদক: তিনি হাঁটেন, কথা বলেন, নিজে গবাদি পশু চরান- রক্ত-মাংসের জ্যান্ত একজন মানুষ। অথচ সরকারি নথিপত্রে তিনি ‌‌‘মৃত’! অবিশ্বাস্য ও অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার চণ্ডিগড় ইউনিয়নের মউ গ্রামে। হতভাগ্য বৃদ্ধ মো. আব্দুল মজিত। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে নিয়মিত বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসলেও, গত ১৮ মাস ধরে তার ভাতা বন্ধ। কারণ খুঁজতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ পরিবারটির- ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো তালিকায় তাকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।

জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে অন্যের নামে ভাতা করে দেওয়ার জালিয়াতির পেছনে সাবেক স্থানীয় ইউপি সদস্য ও সমাজসেবা কর্মীদের সরাসরি হাত রয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।

গত ৪ এপ্রিল (শনিবার) বৃদ্ধ আব্দুল মজিতের বাড়িতে গেলে তিনি আক্ষেপের সঙ্গে তার করুণ অবস্থার কথা জানান। তিনি বলেন, “বহুত বছর ধরে ভাতা পাইতাম। গত ১৮ মাস ধরে টাকা পাই না। অফিসে গেলে বলে আমার নামের পাশে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে।” এই বয়সে এসে ছেলেদের সংসারে বোঝা হয়ে থাকতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, “আমি বয়স্ক মানুষ, নিজের তো কামাই নাই। ছেলেদের ওপর ভাত খাই, দুইটা পয়সা লাগে, তারা কোত্থেকে দেবে? আমার নামের পাশে ওরা ‘মৃত্যু’ লিখে রাখছে।”

আব্দুল মজিতের ছেলে মো. আবুল বাশার জানান, বাবার ভাতার টাকা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তারা ইউনিয়ন পরিষদের দ্বারস্থ হন। সেখানে নূর ইসলাম নামে এক কর্মী এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইদুল মেম্বারের কাছে বারবার ধর্ণা দেন তারা। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঘুরিয়েও কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। উল্টো তাদের কাছে চা-নাস্তা খাওয়ার নামে বারবার টাকা নেওয়া হয়েছে।

আবুল বাশার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেম্বার ও নূর ইসলাম মিলে আমার বাবার নাম কেটে অন্য নাম বসিয়ে টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা করেছে। তারা আমাকে নানা রকম ভুয়া কাগজপত্র, চেয়ারম্যানের সই, আইডি কার্ডের ফটোকপি আনার নামে দিনের পর দিন ঘুরিয়েছে। ১৮ মাস পার হয়ে গেলেও আমার বাবা এক টাকাও ভাতা পাননি।”

আরেক ছেলে মো. কামাল হোসেন বলেন, আমার বাবা বয়স্ক মানুষ, ওষুধপত্র লাগে, পান-সুপারি খায়। আমরা ছয় ভাই দিনমজুর, খুব কষ্টে সংসার চালাই। বাবার ভাতাটা চালু থাকলে অন্তত তার হাতখরচটা চলতো। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।”

একজন অসহায় জীবিত বৃদ্ধের সাথে এমন অমানবিক তামাশায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মউ গ্রামের সাধারণ মানুষ। প্রতিবেশী মো. মাসুদুর রহমান ফকির বলেন, “আব্দুল মজিত আমার প্রতিবেশী দাদা। ১৫ বছর ধরে তিনি ভাতা পাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাকে মৃত দেখিয়ে ভাতা বন্ধ করে দেওয়াটা দায়িত্বশীলদের চরম অবহেলা ও দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ। একজন জীবিত মানুষকে যারা কাগজে-কলমে মৃত বানিয়েছে, আমরা এই চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

কার ভুলে বা জালিয়াতিতে জীবিত মানুষ মৃত হলেন, এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাঠপর্যায়ের সমাজসেবা কর্মীর মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ।

চণ্ডিগড় ইউনিয়নের সমাজকর্মী নূরুল ইসলাম এ ঘটনার দায় সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদের ওপর চাপিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট (মৃত্যু সনদ) ও তালিকার ভিত্তিতেই আব্দুল মজিতকে মৃত দেখানো হয়েছে। দাপ্তরিকভাবে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের স্বাক্ষর করা তালিকা ও মৃত্যু সনদ তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, চণ্ডিগড় ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাইদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আব্দুল মজিত তার খুব কাছের প্রতিবেশী, তিনি তাকে যথেষ্ট সম্মান করেন এবং জীবিত মানুষকে মৃত বানানোর পেছনে তার কোনো হাত নেই দাবি করে তিনি বলেন, সমাজসেবা অফিসের কাগজেই হালকা দাগ বা ‘লাল কালির টিক চিহ্ন’ দিয়ে তাকে মৃত দেখানো হয়েছিল।

তিনি (ইউপি সদস্য) আরও দাবি করেন, আব্দুল মজিতের ভাতার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি নিজে ভুক্তভোগীর ছেলেকে নিয়ে পাঁচ-ছয়বার সমাজসেবা অফিসে এবং নূরুল ইসলামের কাছে গেছেন। বর্তমানে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দায়িত্বে বা এলাকা ছাড়া হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুল তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দায় চাপান ইউনিয়ন পরিষদের ওপর। তিনি জানান, “ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতিস্থাপনের জন্য যে তালিকা দেওয়া হয়, সেখানে মৃতদের নাম বাদ দিয়ে নতুনদের নাম যুক্ত করা হয়। সেই তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদ আব্দুল মজিতকে মৃত ঘোষণা করে রেজুলেশন ও প্রত্যয়নপত্র পাঠিয়েছে। যেহেতু ইউপি থেকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, তাই আমরা তার ভাতা বন্ধ করে অন্যজনকে দিয়েছি।”

তবে দীর্ঘ দেড় বছর পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। এ বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা বলেন, “সম্প্রতি আমরা সরেজমিনে তদন্ত করে দেখেছি লোকটি আসলে জীবিত ও ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত আমরা আব্দুল মজিদের ভাতাটি পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করছি। আশা করি খুব শিগগিরই তিনি তার ভাতা ফেরত পাবেন।”

বিষয়টি নিয়ে দুর্গাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা আফসানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, এ বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং সমাজসেবা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে দ্রুত তার বয়স্ক ভাতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন।

একজন জীবিত মানুষকে কীভাবে মৃত্যু সনদ দেওয়া হলো এবং মাঠপর্যায়ের কর্মী নূরুল ইসলাম সরেজমিনে যাচাই না করে কীভাবে প্রতিবেদন দিলেন, তা নিয়ে তিনিও (ইউএনও) প্রশ্ন তোলেন। পুরো বিষয়টি কীভাবে ঘটল এবং কোন সনদের ভিত্তিতে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে, তা বিস্তারিত তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ইউএনও। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন ইউএনও।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে হয়তো আব্দুল মজিত তার হারানো ভাতা পুনরায় ফিরে পাবেন। কিন্তু জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো এবং ‘কাগজে-কলমের’ জালিয়াতির পেছনে প্রকৃত দোষী কে- ইউপি সদস্য না চেয়ারম্যান নাকি সমাজকর্মী? প্রশাসনের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই রহস্যের জট খুলবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

Exit mobile version