Site icon দ্যা মেইল বিডি / খবর সবসময়

দেশের প্রাচীনতম কুমার দ্বিজেন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি আধুনিকায়নের উদ্যোগ ডেপুটি স্পিকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় ১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন ‘কুমার দ্বিজেন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি’ পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে তিনি ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেন এবং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি লাইব্রেরির জায়গা দখলদার এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

পরিদর্শনকালে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “ইন্টারনেটের তথ্য মতে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পটুয়াখালীর লাইব্রেরিকে দেশের সবচেয়ে পুরোনো বলা হলেও, আমাদের এই কুমার দ্বিজেন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি ১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ এটি ১৬০ বছরেরও বেশি (প্রায় ১৮৬ বছর) পুরোনো। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছাড়া একটি সমাজ বা রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না, এ উপলব্ধি থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”

লাইব্রেরির বর্তমান জরাজীর্ণ অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটি সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য ইতোমধ্যেই আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের প্রাথমিক আবেদন করেছি। খুব শিগগিরই হয়তো সংস্কার কাজের জন্য দুই-তিন লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে। উপজেলা পরিষদ থেকেও এর উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে। আমরা চাই লাইব্রেরিটি যেন শুধু নামেই নয়, বরং একটি আধুনিক গবেষণাকেন্দ্র ও কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে গড়ে ওঠে।”

এ সময় তিনি স্থানীয়দের মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমি রাস্তায় বের হলেই সবাই শুধু বালুর দাবি করেন। কিন্তু শিক্ষার দাবি কেউ করেন না। আপনাদের সন্তান সুশিক্ষিত হলে সমাজ ও দেশ উন্নত হবে। দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তা হতে দেওয়া যায় না।”

লাইব্রেরির ভূমি বেদখল প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পিকার কঠোর ভাষায় বলেন, “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কে বা কারা এই লাইব্রেরির জায়গা দখল করে রেখেছে, তা দেখতে চাই না। যত দ্রুত সম্ভব লাইব্রেরির জায়গা লাইব্রেরিকে ফিরিয়ে দিন।”

এছাড়া তিনি মাদকের বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে আমরা লাইব্রেরি আধুনিকায়ন, নদীর পাড়ে হাঁটার রাস্তা এবং খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করব।”

অনুষ্ঠানে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা আফসানা তার বক্তব্যে বলেন, “দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী কুমার দ্বিজেন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি গর্বের একটি স্থান। এটি প্রায় ২৪ শতাংশ জায়গা জুড়ে বিস্তৃত থাকলেও, বর্তমানে এর খুব সামান্য অংশই লাইব্রেরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। মাননীয় ডেপুটি স্পিকারের দিকনির্দেশনা এবং উদ্যোগে লাইব্রেরিটি পুনরায় শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনগণের জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”

লাইব্রেরির অতীত ইতিহাস ও বর্তমান সংকট তুলে ধরে দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, “একসময় এ লাইব্রেরিতে মহারাজাদের আমলের বহু দুর্লভ বই, মূল্যবান আসবাবপত্র এবং সমৃদ্ধ সাহিত্য আড্ডা ছিল। দেশের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সাহিত্যিকরা এখানে আসতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় লাইব্রেরিটি মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল এবং এর মূল্যবান সম্পদ লুটপাট হয়ে যায়। লাইব্রেরির জায়গা কুচক্রী মহল দখল করে নেয়।”

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি স্থানীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে এবং প্রশাসনের সহায়তায় লাইব্রেরিটি পরিষ্কার করে পুনরায় বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তিনি এর পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ডেপুটি স্পিকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

পরিদর্শনকালে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল লাইব্রেরির ভেতরের তাকগুলো ঘুরে দেখেন এবং সেখানে থাকা পুরোনো বইপত্রের খোঁজখবর নেন। এ সময় নেত্রকোনা জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. নুরুজ্জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী এ লাইব্রেরিটি রক্ষায় এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দুর্গাপুরের সচেতন মহল।

Exit mobile version