গণভোট যে অধ্যাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটিকে আর বিল আকারে সংসদে পাস করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই সুরে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। দলটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এ নিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশটি আগামী ১২ এপ্রিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। সরকারের শীর্ষ দু’জন প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে গণভোট প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি শুরু হয়েছে। সংসদের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে সরকার ও বিরোধী দল।
গণভোট যে অধ্যাদেশের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটিকে আর বিল আকারে সংসদে পাস করার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। একই সুরে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। দলটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে এ নিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশটি আগামী ১২ এপ্রিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। সরকারের শীর্ষ দু’জন প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে গণভোট প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি শুরু হয়েছে। সংসদের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। এ ছাড়া গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান একাধিকবার বলেছেন, জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে তারা প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র মতে, বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় দলীয় প্রতীক ধানের শীষ এবং একইসাথে গণভোটের পক্ষে ভোট দিতে বলেছিলেন। তারা বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটে জনগণের দেয়া রায়কে তারা সম্মান করবেন। বিরোধীদের দাবি, যদিও সরকার গঠন করার পরপরই বিএনপির শীর্ষ নেতারা জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে নানা বিরূপ মন্তব্য করেছেন। বর্তমান স্পিকার মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী থাকাকালীন সময় বলেছিলেন, গণভোটের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। একটি বিশেষ ‘এলিট গোষ্ঠী’ এটি সাধারণ জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। বিএনপি রাজি না হলে দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না, এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই বিএনপি ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করেছে।
গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ এবং এর প্রস্তাবনাগুলোর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে চার কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি। অপর দিকে, সংবিধান সংস্কারের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট পড়েছে দুই কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি। নির্বাচনের পর এসব তথ্য জানান ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো: রুহুল আমিন মল্লিক। তিনি জানান, গণভোটে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা সাত কোটি দুই লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি ভোট। সব মিলিয়ে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি, যা মোট ভোটের ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোট বাতিলে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে রাজনীতিতে তীব্র অস্থিরতা, সরকারের বৈধতা সঙ্কট এবং বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। বিরোধী পক্ষ সরকারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আন্দোলনের ডাক দিতে পারে। সরকার পক্ষ হয়তো সাংবিধানিক বা আইনি কারণ দেখিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেবে। এর ফলে রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা, মাঠের লড়াই ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গণভোট বাতিলের ঘোষণা সরাসরি জনগণের মতপ্রকাশের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সঙ্কট আরো গভীর করতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, গণভোট বাতিল হলে বিরোধী দলগুলো এটিকে অবৈধ ঘোষণা করে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের ডাক দিতে পারে। সরকার ও সংসদের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। জনগণের সরাসরি মতামতের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ায় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে। সর্বোপরি দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান সীমিত এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রয়োগযোগ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের অধ্যাদেশ জারি করা স্বাভাবিকভাবেই সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার সীমা কোথায়। যদি সেটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো স্পর্শ করে, তাহলে তা বিচারিক পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মতে, গণভোটকে পুরোপুরি অস্বীকার করা ঠিক হবে না, বরং প্রয়োজন হলে সংসদের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়ানো যায়। গণভোট বাতিল হলে তা নিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
গণভোট বাতিল করা হলে নির্বাচিত সংসদ আইনগত সঙ্কটে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, বর্তমান আইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণভোট বাতিলের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যদি কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে সেটি বাতিল করা হয়, তাহলে সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলও আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। শিশির মনির দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে প্রায় ৩০টি বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য হয়েছিল। তবে বর্তমানে এসব বিষয় বাস্তবায়নে বিএনপি টালবাহানা করছে।
গণভোটের ফলাফল এবং জনরায় প্রত্যাখ্যান না করতে বর্তমান সরকারকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেছেন, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হওয়ার পর এই রায়কে উপেক্ষা করা জাতির সাথে স্পষ্টত তামাশা ও প্রতারণার শামিল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপি তো জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। যেহেতু গণভোটের রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে পড়েছে, সেহেতু ক্ষমতাসীন দল হিসেবে এর বাস্তবায়ন করার দায় আছে বিএনপির। তারা আগের অবস্থান থেকে সরে গেলে তাদের রাজনৈতিক ব্যত্যয় ঘটবে। বিরোধী দলের সাথে এখনই দূরত্ব তৈরি হলে তা রাজপথে গড়াবে বলে মত তার।
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি সবসময় বলছি যে, গণভোটের বিষয়ে এখন যে বিতর্ক হচ্ছে, তার সমাধান সংবিধানে খোঁজা হচ্ছে। সংবিধানে এর সমাধান নেই। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ভিত্তিতে নয়, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে। সরকার যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে এবং গণভোটে মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেখানেই এর সমাধান আছে। তিনি বলেন, আইন অঙ্গনে একটা ডকট্রিন আছে, ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন’। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিষয়। কতগুলো রাজনৈতিক বিষয় আছে, রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় আছে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয় আছে, সেগুলো আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত হওয়া উচিত। এখানে ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন’ প্রয়োগ হতে পারে। বিএনপির প্রতি তিনি বলেন, সরকার গঠনের শুরু থেকে বিভক্তি, অনৈক্য সৃষ্টি করে তারা কিভাবে লাভবান হবে, সেটি বোধগম্য হচ্ছে না। বরং এর মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তিনি। এই জটিলতার কারণে পলাতক শক্তির ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে।
এদিকে জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। সোমবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, গণভোটের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে গুম-খুনের ‘আয়নাঘর’কে সমর্থন করা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জনগণের আকাক্সক্ষা ও গণভোটকে ইগনোর (উপেক্ষা) করা হলে গোটা বাংলাদেশ আবারো জেগে উঠবে। জয়পুরহাট-১ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য মো: ফজলুর রহমান সাঈদ বলেছেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামী কেয়ারটেকার সরকারের দাবি জানিয়েছিল। তখন বিএনপি সেটি মানতে অস্বীকার করেছিল। যদিও পরবর্তীতে গণ-আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার কেয়ারটেকার সরকার মানতে বাধ্য হয়েছিল। সেই ইতিহাস আবারো বিএনপি সরকারকে স্মরণ করে দিয়ে তিনি বলেন, আমার আহবান থাকবে, আর যেন রাস্তায় নেমে দাবি আদায়ে জনগণকে জীবন দিতে না হয়।
গণভোট ইস্যুতে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান এ প্রতিবেদককে বলেন, এখনো বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে বিএনপি জুলাই স্পিরিটকে ধারণ করেই এগিয়ে যাবে। সব মিলিয়ে সরকারের দেড় মাসের মাথায় ফের উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে রাজপথ। এখন দেখার বিষয় সরকার ও বিরোধী দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান জাতীয় রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।

