বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্প্রতি উচ্চকক্ষ–নিম্নকক্ষ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ভবিষ্যতের পথরেখা’য় উচ্চকক্ষের গঠন, পদ্ধতি ও এখতিয়ার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কিছু বিষয়ে কোন কোন দল একমত হলেও, কিছু বিষয়ে অনেক রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। কেউ বলছেন, উচ্চকক্ষ হলে সংসদ আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে; আবার কেউ মনে করছেন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এ মুহূর্তে উচ্চকক্ষের প্রয়োজন নেই, এটি হবে অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন; তা হলো—বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচ্চকক্ষ কি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি এটি সমস্যার ভুল সমাধান? বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ—এই কথাটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিচয় নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব সীমাবদ্ধতারও নির্দেশক। উন্নয়নশীল দেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও চাহিদার আধিক্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তা—এই মৌলিক খাতগুলোতেই বাংলাদেশের বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়, তবুও চাহিদার তুলনায় তা অপর্যাপ্ত থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় নতুন একটি সংসদীয় কক্ষ গঠন মানে রাষ্ট্রের ওপর একটি স্থায়ী ও বাড়তি অর্থনৈতিক বোঝা চাপানো। উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় প্রয়োজনে কমানো বা পুনর্বিন্যাস করা যায়, কিন্তু সংসদীয় কাঠামোর ব্যয় বন্ধ বা হ্রাস করা বাস্তবে সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বা রাজস্ব ঘাটতির সময়েও এসব ব্যয় বহাল রাখতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।
যেখানে বহু সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, সরকারি হাসপাতালে শয্যা ও চিকিৎসক স্বল্পতা, তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই; সেখানে আরেকটি সংসদীয় কক্ষ গঠনের ব্যয় নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। উন্নয়নশীল দেশের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি টাকাই হওয়া উচিত মানব-উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিমুখী। উচ্চকক্ষ গঠন কেবল একটি সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অঙ্গীকার।
এই অঙ্গীকার করার আগে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে—এই অর্থ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানে ব্যয় করা হয়, তবে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল কতটা বেশি হতে পারত। সেই তুলনায় উচ্চকক্ষের আর্থিক ব্যয় বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন বাস্তবতায় একটি ভারী বোঝা হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময় ও সিদ্ধান্তের গতিশীলতা। ছোট ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায়ই জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক অস্থিরতার সময়।
উচ্চকক্ষ যুক্ত হলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ধাপ বাড়বে, আলোচনা দীর্ঘ হবে এবং কখনো কখনো দুই কক্ষের টানাপোড়েনে রাজনৈতিক অচলাবস্থাও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় মেরুকরণ ও অবিশ্বাস একটি বড় বাস্তবতা। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদে প্রায়ই দেখা যায়—দুই কক্ষ ভিন্ন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থাকলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া আটকে যায়। অনেক দেশে এটি “চেক অ্যান্ড ব্যালান্স” হিসেবে কাজ করলেও বাংলাদেশের মতো সংঘাতপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নিতে পারে।
আইন পাস না হওয়া, বাজেট বিলম্বিত হওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকার ঝুঁকি এখানে বাস্তব ও তাৎক্ষণিক। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে মৌলিক একটি প্রশ্নটি উঠে আসে—যেখানে বর্তমান এককক্ষ বিশিষ্ট সংসদই তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারছে না, সেখানে আরেকটি কক্ষ যোগ করে আদৌ কী অর্জিত হবে? সংসদীয় বিতর্ক যদি দুর্বল হয়, সংসদীয় কমিটিগুলো যদি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারে, আর বিরোধী দল যদি প্রকৃত অর্থে নীতি ও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন একটি কক্ষ যোগ করলেও সেই মৌলিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে। বরং আশঙ্কা হলো, উচ্চকক্ষ বিদ্যমান রাজনৈতিক দুর্বলতাকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
যদি এটি দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমে গঠিত হয়, বাস্তবে তা দলীয় মনোনয়নের ক্লাব বা অবসর-জোন হতে পারে। এমনকি এটি ক্ষমতাসীনদের জন্য আরেকটি নিয়ন্ত্রণমূলক বলয়েও পরিণত হতে পারে। আবার ভিন্ন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থাকলে সেটি আইন ও বাজেট আটকে দেওয়ার কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। উচ্চকক্ষের পক্ষে যে যুক্তিটি সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, তা হলো—বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী; সংসদ, সরকার ও দলীয় সিদ্ধান্ত প্রায় একই কেন্দ্রে আবদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে উচ্চকক্ষকে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার একটি ‘ব্রেক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে; যুক্তিটি একেবারে অমূলক নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভারসাম্য আনার একমাত্র পথ কি উচ্চকক্ষ? বাস্তবে উচ্চকক্ষ ছাড়াই ক্ষমতার ভারসাম্য আনা সম্ভব—যদি আমরা মৌলিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিই। কার্যকর সংসদীয় বিরোধী দল, শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন—এই উপাদানগুলোই একটি গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। এগুলো ছাড়া নতুন কোনো কাঠামো যুক্ত করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং সমস্যাই বহুগুণে বেড়ে যাবে।
বাস্তবে দেখা যায়, ক্ষমতার ভারসাম্য কেবল কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। একটি শক্তিশালী উচ্চকক্ষও যদি দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে কাজ করে, তবে সেটি ভারসাম্য রক্ষার বদলে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র বা নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। তাই কাঠামো বাড়ানোর আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিদ্যমান কাঠামো কি তার সম্ভাব্য ভূমিকা পালন করতে পারছে? সংলাপ, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সাংবিধানিক চেতনার চর্চা ছাড়া কোনো কাঠামোই কার্যকর হয় না।
উচ্চকক্ষ হোক বা এককক্ষ—রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ থাকে, তবে নতুন কাঠামো সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমস্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তাছাড়া, উচ্চকক্ষকে যদি এমন এক ব্যবস্থার ওপর বসানো হয়, যেখানে ভিত্তিটাই দুর্বল, তাহলে সেটি হবে “ভাঙা বাড়ির উপর আরেকটি তলা” যোগ করার মতো।
আগে দরকার ভাঙা বাড়ি মেরামত করা—সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী কণ্ঠকে শক্তিশালী করা, প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করা। সংস্কার ছাড়া উচ্চকক্ষ নয়, সংস্কারই হোক অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাই মূল বিতর্কটি হওয়া উচিত—নতুন কাঠামো নয়, বিদ্যমান কাঠামোকে কার্যকর করা; সেই পথেই টেকসই ও বাস্তব সমাধান লুকিয়ে আছে।
