গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে ব্রহ্মপুত্র নদের চরে সূর্য ওঠে। কিন্তু সেই সূর্যালোক গাইবান্ধার চরাঞ্চলের শিশুদের জীবনে খুব বেশি উষ্ণতা আনতে পারে না। নদীর বুকে জন্ম নেওয়া এসব শিশুর শৈশব কাটে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা বড় হচ্ছে এক অনিরাপদ পরিবেশে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন।
এসব এলাকায় পৌঁছাতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লে চরগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। তখন স্কুল, হাসপাতাল কিংবা বাজার—সবকিছুই হয়ে ওঠে দূরস্বপ্ন। মানিককর চরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল করিম জানান,“বর্ষার সময় অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী স্কুলে আসতে পারে না। অনেকেই ঝরে পড়ে, কেউ কেউ আর ফিরেই আসে না।” দুর্বল যাতায়াত ব্যবস্থা ও দারিদ্র্য শিশুশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক শিশুকে পরিবারের আয়ের জন্য ছোট বয়সেই কাজে নামতে হয়। নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে বারবার স্থানান্তরের ফলে শিক্ষাজীবন বারবার ছিন্ন হচ্ছে। ফলে চরাঞ্চলের শিশুরা সুস্থ মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষার পাশাপাশি চরাঞ্চলের শিশু স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব ও সীমিত স্বাস্থ্যসেবার কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
অনেক শিশুই স্বাভাবিক ওজন ও উচ্চতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। উজালডাঙ্গা চরের সালমা বেগম বলেন,“শিশু অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে অনেক সময় লাগে। নৌকা না পেলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।” এদিকে চরাঞ্চলে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল ও ওষুধের সংকট রয়েছে। নিয়মিত টিকাদান ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম দুর্গমতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক রোগ প্রাথমিক অবস্থাতেই জটিল রূপ নিচ্ছে, যা শিশু মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চরাঞ্চলের শিশুরা স্বপ্ন দেখে। কেউ শিক্ষক হতে চায়, কেউ ডাক্তার।
কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে সেই স্বপ্ন বারবার ধাক্কা খায়। সুস্থ পরিবেশ, নিরাপদ শৈশব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে এসব স্বপ্ন পূরণ অনিশ্চিতই থেকে যাবে। মানবাধিকারকর্মী সালাউদ্দিন কাশেম জানান, চরাঞ্চলের শিশুদের সুরক্ষায় আলাদা ও টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভ্রাম্যমাণ স্কুল ও চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, পুষ্টি সহায়তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই অঞ্চলের শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
শিশু অধিকারকর্মী ও সৃজনশীল গাইবান্ধার সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন , প্রতিকূলতাকে জয় করে বড় হওয়া এসব শিশুদের জন্য এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হবে। চরাঞ্চলের শিশুরা কেবল সহানুভূতি নয়, চায় তাদের প্রাপ্য অধিকার।
