তামজিদ হোসেন মজুমদার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বৃত্তের গুলিতে একটি হত্যা শুধু একটি স্বপ্ন কে মাটি চাপা দেয় না, তার সঙ্গে বিলীন করে লাখো সম্ভাবনার। বর্তমান সময় দুর্বৃত্তের বন্দুকের মুখে নিভে যায় মানুষের বেঁচে থাকার সব আশা। এক ট্রিগারে সন্তান হারায় বাবা, মা-বাবা হারায় সন্তান, প্রিয়তমা হয় বিধবা। শত শত পরিবারের অশ্রুতে ভারী হয়ে উঠে এই নগরী।
কে কাকে দোষ দেবে? নাকি সবই কপাল? মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৬০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৫১৮ জন আহত হন, যাদের মধ্যে ৯৭ জন ছিলেন গুলিবিদ্ধ। সংখ্যাগুলো নেহাতে পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে রয়েছে রক্তমাখা কাহিনি, ভেঙে পড়া পরিবার, মুখ থুবড়ে পড়া এক মানবিকতা।
তারা কল্পনাও করেনি মৃত্যু এভাবে হবে। তারা চেয়েছিল একটি স্বাভাবিক মৃত্যু, কিন্তু দুর্বৃত্তরা তা হতে দেয়নি, সঙ্গে বিনষ্ট করে দিয়েছে এক বুক ভরা আশা। এই লেখায় ভুক্তভোগীর মনোজগৎ থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। যখন একজন মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার হারিয়ে দুর্বৃত্তের লক্ষ্যে পরিণত হন, তখন তার দুঃখ ভারাক্রান্ত মনোভাবকে ভাষা দেওয়ার প্রয়াস এটা। আমার পরিবারে স্ত্রী ও এক ছেলে রয়েছে “খুলনায় সোহেল হাওলাদার (৪৫)”, ৬ নভেম্বর রাতে রূপসার নৈহাটি বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা আমাকে একে একে আটটি গুলি করে,ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারাই।
রুটি ও দই কেনার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে বাড়িতে ফিরতে দিল না, চিরতরে বাড়ি ফেরা বন্ধ করে দিল। আর কোনোদিন স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফিরে যেতে পারবো না! আমার নামটা দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনও জানেই না “সিয়াম মজুমদার(১৯)”, পরিবারের টানাপড়েনে সপরিবারে ঢাকাই আসি একটু সচ্ছলতার আশায়। আমার বাবা রিকশা চালাই, মা বাসাবাড়ি কাজ করে। আমি মগবাজার একটি মোটর পার্টসের দোকানে কাজ করি।
২৪ডিসেম্বর দোকানে চা আনতে গিয়ে মাথার ওপরে ককটেল বিস্ফোরণে প্রাণটা হারিয়েছি। মানুষের মৃত্যু তো একটি নিশ্চিত ঘটনা। তাই বলে এতটা বীভৎস মৃত্যু! কারা এই ককটেল ছুড়ল, কে আমার প্রাণটা কেড়ে নিল, তা আমার আর কখনো জানা হবে না। এখন আমার পরিবারের পাশে কে থাকবে? আমি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী আধিপত্যবাদ বিরুদ্ধে ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে একাই দাঁড়িয়েছিলাম।
এবং দেশের আপামর জনতার প্রতিনিধিত্ব করতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছি। তবে, তারা আমাকে সহ্য করতে পারেনি। ১২ই ডিসেম্বর জুম্মার নামাজের পরে নির্বাচনি প্রচারের উদ্দেশ্যে রিকশায় যাওয়ার সময় বিজয়নগর কালভার্ট রোডে দুপুরের দিকে হেলমেট পরা ২জন ব্যক্তি আমার মাথায় গুলি করে চলে যায়। দীর্ঘ ৭দিন জীবন মৃত্যুর লড়াইয়ের পরে ১৮ই ডিসেম্বর আমার হাসি মুখটা নিয়ে আল্লাহর নিকট চলে যায়।
আপনারা আমার জন্য দোয়া করিয়েন, আর আমার সন্তানটাকে দেখি রাখিয়েন। একটা সমাজ কতটা বর্বরতা হলে আমার সাথে এমন বীভৎস কাজ করতে পারে, নিজে সাথে না ঘটলে বিশ্বাস হতোনা। আমি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হতভাগা ভ্যানচালক “ওমর ফারুক(৩৯)”, আমাকে ১৭ই ডিসেম্বর চুরির অভিযোগে ভবানীগঞ্জের সিএনজি মালিক সমিতির সদস্যরা লোহার রড দিয়ে পেটাতে থাকে।
এক সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আমাকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে উভয় হাত ও পায়ে হাতুড়ি দিয়ে লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেয় তারা, তখনো তারা আমাকে মারতে থাকে। পানি পান করতে চাইলে নদীতে নিয়ে আমাকে বিবস্ত্র করে চোবানো হয়। এরপর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেয়। তারা আমার জীবনটির কোনো পরোয়া করেনি। পৃথিবীর এই নৃশংস চেহারা দেখে ২০ডিসেম্বর চিরবিদায়-নি।
শুধু দেশের মধ্যে নয় সীমান্তেও গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী : ২০২৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৩০ জন নিহত হন। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু কি আজ বিলাসিতা? দেশে নানান প্রান্তে দুর্বৃত্তের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে নানান পেশাজীবী মানুষ, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যেখানে মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার সবার ঊর্ধ্বে, সেখানে দুর্বৃত্তের গুলি কেন নিয়ন্ত্রিত হবে আমাদের জীবন? সময় এসেছে কথা বলার, প্রশ্ন করার।
আমাদের চাই একটি দেশ যেখানে মৃত্যু হবে শান্তির, স্বাভাবিকের, কোনো দুর্বৃত্তের গুলিতে নয়। আমাদের চাই একটি স্বাভাবিক দিন : যার সকালটা হবে ভোরের কুয়াশাময় চাদরে ঢাকা। গাছিরা ধীর গতিতে চোটে চলবে খেজুর রস সংগ্রহতে। আর ঐ পূর্ব আকাশে সাধাময় হলদে রঙের সূর্যের উদয় ঘটবে। যার আগমনে চারপাশে পাখির কিচিরমিচির শব্দ এবং শিশির বিন্দু চিক-মিক করে উঠবে প্রতিটি পাতায়। অন্যদিকে খবরের পাতায় ফুটে উঠবে প্রকৃতি সৌন্দর্যের রূপের বর্ণনা। সেখানে থাকবে না মানুষের কান্নার আহাজারি।
