গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধা পৌর পার্কে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙিন বেলুনের ঝাঁক। সেই বেলুনের সঙ্গেই সারাদিন ঘুরে বেড়ায় সাত বছরের শিশু রবিউল ইসলাম। বয়সে যখন তার হাতে থাকার কথা খাতা-কলম, তখন তার কাঁধে সংসারের ভার। রবিউলের বাবা নেই। বাবাহীন সংসারে মায়ের সঙ্গে সে থাকে গাইবান্ধা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি বস্তিতে। টিনের ছাউনি আর বাঁশের খুঁটির ছোট্ট ঘরটিই তাদের ঠিকানা। প্রতিদিন সকাল হলেই রবিউল বেরিয়ে পড়ে পার্কে—বেলুন বিক্রি করতে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, কখনো সন্ধ্যা—পুরো দিনটাই কাটে তার কাজের মধ্য দিয়ে।
পার্কে খেলতে আসা শিশুদের দিকে তাকিয়ে অনেক সময় থমকে যায় রবিউল। তার চোখে তখন কৌতূহল, আবার চাপা কষ্টও। সে জানে—এই বয়সে তারও খেলার কথা ছিল, স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা তাকে খুব আগেই বড় করে দিয়েছে। বেলুন বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাদের দিন। কোনো দিন বিক্রি ভালো হলে ভাত জোটে, কোনো দিন আধাপেটা খেয়েই ঘুমাতে হয় মা-ছেলেকে। রবিউলের মা বিভিন্ন বাড়িতে কাজ খুঁজে বেড়ালেও নিয়মিত কাজ মেলে না। অসুস্থ হলে বা কাজ না পেলে পুরো সংসারের ভরসা হয়ে দাঁড়ায় এই শিশুটিই।
কথা বলে জানা যায়,রবিউল পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন জুম স্কুলে পড়ে । লেখাপড়ার কথা উঠলেই সে ম্লান হেসে বলে—“ হামার তো অতো ট্যাকা নাই , যে পুতিদিন পড়মো, সারাদিন রাত বেলুন বেচি ১৫০ – ২০০ টাকা পাই এইটা দিয়্যা হামরা চলি ।” শহরের কোলাহলের ভিড়ে রবিউলের মতো আরও অনেক শিশুই বেড়ে উঠছে নীরব কষ্ট নিয়ে। তারা পরিসংখ্যান নয়, তারা বাস্তব মানুষ—যাদের শৈশব প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে।
রবিউলের হাতে ধরা রঙিন বেলুনগুলো যেন তার অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক। ” সৃজনশীল গাইবান্ধা” নামের একটি সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, “রবিউলের মতো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুনর্বাসন কোনো একক উদ্যোগে সম্ভব নয় এ জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, সরকার ও বেসরকারি সংগঠনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। প্রথমত, তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে খাবার, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থাকবে।
দ্বিতীয়ত, অপ্রাতিষ্ঠানিক ও জীবনমুখী শিক্ষা চালু করে ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, কিশোর বয়সে পৌঁছালে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে হবে, যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।
পাশাপাশি, পরিবারের সঙ্গে পুনঃসংযোগ সম্ভব হলে পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তা ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। সর্বোপরি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারলেই রবিউলদের রঙিন স্বপ্ন আবার নতুন করে রঙ পেতে পারে।
