তামজিদ হোসেন মজুমদার,ববি
প্রেমিকাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে ‘চোর’ অপবাদ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা পথ বেচে নিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়(ববি) ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগী।
তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি ড.শারমিন আক্তার। ৩জানুয়ারি (শনিবার) রাতে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা বৌলতলী নিজ বাড়িতে শুভ বৈরাগী ঝুলন্ত মরদেহটি উদ্ধার করেন স্বজনরা। পহেলা জানুয়ারি(বৃহস্পতিবার) শুভ বৈরাগী আত্মহননের কারণটি সামাজিক যোগাযোগে এক পোস্টের মাধ্যমে জানান, তিনি লিখেন, আমি শুভ বৈরাগী একটি মেয়েকে ভালোবাসি,নাম তার “সঙ্গীতা বাড়ৈ”।
১লা জানুয়ারি তার জন্মদিন হওয়ায় তাকে সামনাসামনি শুভেচ্ছা জানাতে ৩১ডিসেম্বর রাতে সঙ্গীতার সাথে দেখা করতে তার বাড়ি যাই। এসময় তার জেঠামশায় আমাকে দেখে পেলে এবং ধরে মারধর করে রক্তাক্ত করে ফেলে। এক পর্যায়ে তার জেঠার কাছে আমি আমাদের সম্পর্কের কথা খুলে বলি। এরপর তিনি আমাকে অক্ষত ভাষায় গালিগালাজ করেন। তারপরেও তাদের ক্ষোভ মেটেনি, আমাকে মেরে ফেলবে, কেটে ফেলবে এসকল ভয়ভীতি দেখিয়ে চড়, কিল, ঘুষি দিয়ে জোরপূর্বক মিথ্যা ভিডিও বানায়। সেখানে আমাকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয় যে,”আমি তাদের বাড়িতে চুরি করতে গেছি”।
তিনি আরো লিখেন, তারা আমাকে চোর হিসেবে সকলের সামনে তুলে ধরে। আমাকে মিথ্যা চোর অপবাদ দিয়ে সকলের কাছে দোষী করে। এতে আমার মানসম্মান নষ্ট হয়। আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারবো না। তারা এসব করে আমাকে জানে মারার চেয়েও জীবিত মেরে ফেলেছে। তিনি লিখেন, সঙ্গীতার সাথে আমার দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সম্পর্ক। এই দুই বছরে আমাদের রীতিমতো ভিডিও কলে কথা হতো, দৈনিক যোগাযোগ হতো। অনেকবার তার সাথে দেখা হয়েছে।
কিন্তু তারা এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। কারণ আমার অর্থ সম্পত্তি নেই। তাদের মেয়ে সব জেনেশুনে আমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। কিন্তু সেও এখন আমার ভালোবাসার থেকে পরিবারের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখাচ্ছে। আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে তারা। শুভ বৈরাগী ফেসবুক পোস্টে তার আত্মহননের জন্য প্রেমিকা সঙ্গীতা বাড়ৈ ও তার বাবা, কাকা, জেঠুসহ পরিবারের সবাইকে দায়ী করেন। এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান।
শুভ বৈরাগী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জ সদর বৌলতলী গ্রামের প্রয়াত সুখলাল বৈরাগী ও শেফালী বৈরাগী দম্পতির ছেলে। শৈশবেই বাবা-মাকে হারায় শুভ বৈরাগী,বোন ও ভগ্নিপতির আশ্রয়ে বেড়ে উঠে। শুভ বৈরাগী চিরবিদায়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আজ(৬ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২ টার সময় শুভ বৈরাগী আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে উপাচার্যসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান। তিনি বলেন,‘‘বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে তার ফলাফল প্রকাশ হবে। সে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন।
কিন্তু তার এই অকাল মৃত্যুতে আমরা খুবই মর্মাহত। আমরা চাই এই আত্মহত্যার পিছনের কারণ তদন্তের মাধ্যমে বের করে এর একটি সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হউক।’’ এসময় বাংলা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেন, আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। কিন্তু পুলিশের তরফ থেকে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মামলা করে কোনো লাভ হবে না। শুভর ভাই-ভাবিকে ভয় দেখানো হয়েছে। আমরা নানাভাবে মামলার বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।
তারা অভিযোগ করে বলেন, পুলিশকে ঐ মেয়ের বাসার লোক আগে থেকেই ম্যানেজ করে ফেলেছে। আমরা বুঝতে পেরেছি এটা একটি পরিকল্পিত হত্যা। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই এবং যারা প্ররোচনা দিয়েছেন তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাই। বাংলা বিভাগের সভাপতি ড.শারমিন আক্তার বলেন, ‘‘শুভ আমাদের সন্তানতুল্য।
আত্মহত্যার আগে সে একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে। সেখান থেকে আমরা জানতে পেরেছি তাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করা হয়েছে। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি এবং প্ররোচনাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’’
