নিজস্ব প্রতিবেদক:নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা যাচাই কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি, হুমকি ও শারীরিক হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রশাসনিক প্রতিনিধি ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দুয়া উপজেলার বলাইশিমুল ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে ও সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিনজন আহত হন। আহতরা বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহত ব্যক্তিরা হলেন- বলাইশিমুল ইউনিয়নের আড়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান, মাইজপাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য কলি আক্তার।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার নেত্রকোনা-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম হিলালী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপিৎর সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলালসহ ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
এরপর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনের দাখিল করা এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর দৈবচয়ন পদ্ধতিতে যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে বুধবার দুপুরে কেন্দুয়ার গড়াডোবা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলাইশিমুল ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন।
স্বাক্ষর যাচাই চলাকালে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকেরা পরিষদে উপস্থিত হলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকরাও সেখানে জড়ো হন। এসময় আনিসুর রহমান ও আবুল কালাম পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালীর অনুসারী একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন- তোফাজ্জল হোসেন ওরফে তাজ্জত, মাজেদুল হক ওরফে দীপক, পারভেজ মিয়াসহ ১০-১২ জন।
আনিসুর রহমান বলেন, লোকজন দেখে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম কী হচ্ছে। তখন তোফাজ্জল, দীপক, পারভেজসহ একদল লোক আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় আবুল কালামও মারধরের শিকার হন। প্রশাসনের উপস্থিতিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া খুবই দুঃখজনক।
ঘটনা থামাতে গেলে সংরক্ষিত নারী আসনের ইউপি সদস্য কলি আক্তারও হামলার শিকার হন। তিনি বলেন, আমি ঝগড়া থামাতে গেলে ধাক্কা ও আঘাত পাই। কোনো কারণ ছাড়াই এভাবে হামলা করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্বাক্ষরের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় আনিসুর হকের ওপর আবারও হামলার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি কয়েকজন ভোটার ও সাক্ষীকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মোজাফফরপুর ইউনিয়নের বটতলা এলাকার ভোটার বাবুল মিয়া অভিযোগ করেন, ফোনকলের মাধ্যমে তাকে স্বাক্ষর প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত তোফাজ্জল হোসেন হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এগুলো মিথ্যা অভিযোগ। দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা বাকবিতণ্ডা হয়েছে, তবে কোনো হামলা হয়নি।
স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ঘটনার সময় আমি দলের চেয়ারপারসনের জানাজায় ছিলাম। বিষয়টি শুনে মর্মাহত হয়েছি। এ ঘটনায় আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।
অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, বিষয়টি এখনো বিস্তারিত জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখব। আমার কোনো সমর্থক জড়িত থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রিফাতুল ইসলাম বলেন, স্বাক্ষর যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে থাকেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার পর থেকে বলাইশিমুল ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় ভোটারদের আশঙ্কা, এ ধরনের ভয়ভীতি ও সহিংসতা অব্যাহত থাকলে স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকেরা দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সব নির্বাচন কার্যক্রমে প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
