নিজস্ব প্রতিবেদক: আদিকালে নতুন ধান ঘরে তোলার সময় সৃষ্টিকর্তা বা সালজং দেবতাকে (সূর্য দেবতা) উৎসর্গ করতেন তৎকালীন সময়ে গারো সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষরা। ফসল গোলা ঘরের তোলার আগেই কৃষকরা আনন্দ উৎসব করতেন। এই সংস্কৃতি ধারণ করার জন্য এ সম্প্রদায়ের প্রজন্মরা, তারা যেন লালন ও বুঝতে পারে এবং এই সংস্কৃতিকে যেন চর্চা করতে পারে এই লক্ষ্যে ‘৫০ দামা ওয়ানগালা’ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির আয়োজনে এবং মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেষা এলাকা কলমাকান্দার পাঁচগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ২৮ ও ২৯ নভেম্বর দুই দিনব্যাপী গারো সম্প্রদায়ের ওয়ানগালা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক কবি পরাগ রিছিলের সভাপতিত্বে ও একাডেমির নৃত্য শিক্ষক মালা মার্থা আরেংয়ের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি, পত্রিকা ও মিলাতায়ন বিভাগের পরিচালক ও কবি ড. সরকার আমিন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও কথাসাহিত্যিক মঈনুল হাসান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, কারিতাসের প্রোগ্রাম পরিচালক অপুর্ব ম্রং প্রমুখ।
এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “এ অঞ্চলে যারা আদিবাসী আছেন, তারা শত শত বছর যাবত এ অঞ্চলে বসবাস করছেন। অত্যন্ত শান্তি প্রিয়ভাবে তারা থাকেন। সোসাইটিটে শিক্ষা ক্ষেত্রে ও সামাজিক উন্নয়নের দিকে দেখেন- তাদের ব্যাপক কন্ট্রিবিউশন আছে। এই কন্ট্রিবিউশনটাকে আমরা ধারণ করি। আমরা আগেও বলেছি- আমাদের দল যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় আসেন, তাহলে আধিবাসীদের উন্নয়নের জন্য, বিশেষ করে তাদের শিক্ষা এবং তাদেরকে অনগ্রসর ব্যবস্থার যে জিনিসগুলো আছে সেগুলোর উন্নয়নে আমরা কাজ করবো।”
এ উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও কথাসাহিত্যিক মঈনুল হাসান বলেন, “কলমাকান্দার পাঁচগাঁও গ্রামে আসতে আসতে শুধু নবান্নের মাঠের গন্ধ নয়, হেমন্তের গন্ধ নয়, হেমন্তের এই দিনে রীতিমত ওয়ানগালা উৎসবের আনন্দ ধ্বনী- সেই আনন্দের গন্ধ পাচ্ছি। সেই আনন্দ ও উৎসবের গন্ধে একেবারে আমরা আপ্লুত ও অভিভূত হয়ে পুরোটা সময় ধরে এই আয়োজন উদযাপন ও উপভোগ করছি এবং সেই সাথে হৃদ্ধ ও সমৃদ্ধ হচ্ছি।”
বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি, পত্রিকা ও মিলাতায়ন বিভাগের পরিচালক ও কবি ড. সরকার আমিন গারো সম্প্রদায়ের তরুণ ও যাদের বয়স কম তাদের উদ্দ্যেশে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কার বাবার? বাংলাদেশ বাঙ্গালীর বাবার না কেবল, বাংলাদেশ সকল বাংলাদেশীর বাবার। বাংলাদেশী সংবিধানে প্রতিটি নাগরিককে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। বাঙ্গালী হিসেবে বাংলাদেশকে যতটা নিজের মনের ও অর্জন করি- তোমরাও কিন্তু সবার এই যে সমান অধিকারের বিষয়টি, আমি আশা করি তোমরা তোমাদের হৃদয়ে রাখবে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নবান্নের শয্য ঘরে তোলার পরে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত হাজার বছরের প্রথা। আমরা আসলে সকলেই প্রকৃতির সন্ত্বান। সেই প্রকৃতির সাথে মানুষের মিলবন্ধন। অল্প একটু সময়ে যেটুকু দেখেছি আমি মুগ্ধ হয়েছি। এটা আনন্দের ঘটনা যে, গারো সম্প্রদায় তাদের নিজেদের কৃষ্টি-কালচার ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তা বহমান থাকবে। যে কোন একটা দেশ ও সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়- তার বৈচিত্রের মধ্য দিয়ে।”
এ উৎসব সম্পর্কে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক ও কবি পরাগ রিছিল বলেন, গ্রামের এই উৎসব আয়োজন করার উদ্দেশ্য হলো- নাগরিক যতগুলো সেবা রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা বাস করেন এবং যারা শহর থেকে দূরে থাকে, তারা অনেক সময় সেবা থেকে বঞ্চিত হন। আমরা মনে করি নাগরিকদেরে যে সেবা পাওয়া উচিত- সেটা সংস্কৃতি হতে পারে বা যে কোন নাগরিক অধিকার। সকলেরই সমভাবে সেবার পাবার অধিকার রয়েছে এবং আমাদের জায়গা থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো, আমাদের সংস্কৃতিটা ছড়িয়ে দিতে। সবক্ষেত্রে সব এলাকায় এ ধরনের অনুষ্ঠান করতে পারি- সেই স্বপ্ন আমরা ধারণ করছি।”
এ উৎসবে যোগ দেন নেত্রকোনা, ধোবাউড়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাঁচটি দল। তারা নিজস্ব সংস্কৃতিতে নৃত্য পরিবেশন করেন। নৃত্যের মাধ্যমে বিভিন্ন যুদ্ধ কৌশল সংগঠিতসহ নানা কিছু প্রদর্শন করেন।
নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতেও এই উৎসবের ধারবাহিকতা চলে আসছে বলে জানান আয়োজক এবং গারো সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ।


