বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজনীতির মাঠের হিসাব-নিকাশ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব- এই দুইয়ের মেলবন্ধনে নেত্রকোনায় ঘটে গেল চাঞ্চল্যকর এক রাজনৈতিক ঘটনা। গত ৩ নভেম্বর নেত্রকোনা পৌর মহিলা দলের ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটির আহ্বায়কের বিগত দিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও আওয়ামী-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তৃণমূল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠলে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই কমিটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে জেলা শাখা।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৃণমূলের রাজনীতিতে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের যে দাবি উঠেছে, নেত্রকোনা পৌর মহিলা দলের সদ্য স্থগিত কমিটি যেন তার এক উল্টো চিত্রই সামনে এনেছিল।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরী (পলপল) এবং সাধারণ সম্পাদক হাফিজা আক্তারের অনুমোদনক্রমে গত ৩ নভেম্বর পৌর মহিলা দলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ৩৩ সদস্যের কমিটিতে আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় নাজমা আলমকে। কমিটি ঘোষণার পরপরই স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

তৃণমূলের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ কর্মী ও সুবিধাভোগীরা এখন বিএনপিতে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এই ক্ষোভের কারণেই একদিনের মাথায় কমিটিটি স্থগিত করা হয়।

দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভের তীব্র বহিঃপ্রকাশ ঘটে ফেসবুকে। নেত্রকোনা জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম তার ফেসবুক আইডিতে কড়া সমালোচনা করে লেখেন, “আওয়ামী লীগ নেত্রী এখন পৌর মহিলা দলের সভাপতি! আওয়ামী লীগের দোসরদের বিএনপিতে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। যেমন নেত্রকোনা পৌর বিএনপি মহিলা দল।” তার পোস্টটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সমালোচনার পালে আরও জোরালো হাওয়া লাগে ‘লাক মিয়া তালুকদার’ নামের অপর এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। সেখানে তিনি সদ্য পদপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নাজমা আক্তারের (আলম) অতীত রাজনৈতিক জীবনের ফিরিস্তি তুলে ধরেন।

লাক মিয়া আক্ষেপের সুরে লেখেন, “নাজমা আক্তার বিগত ১৪ বছর চুটিয়ে আওয়ামী লীগ করেছে। তার প্রভাবে থাকতে পারেনি এলাকার মানুষ। তখন সে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু সাহেবের স্ত্রীর বডিগার্ড হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিত। সময় বদলের সাথে সাথে বিএনপি হয়ে গিয়েছে। গত ৫ই আগস্টের আগে একদিনের জন্য যে মানুষটা বিএনপি করে নাই, আজ সে নেত্রকোনা সদর পৌর মহিলা দলের আহ্বায়ক হয়েছে। হায়রে রাজনীতি!”

প্রমাণ হিসেবে স্থিরচিত্রও সংযুক্ত করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে। তাতে দেখা যায়, নেত্রকোনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু এবং তার সহধর্মিণী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী দীনা আশরাফকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন নাজমা আলম।

এ বিষয়ে জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরীর (পলমল) মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।

পরে কমিটি গঠন এবং পরবর্তীতে তা স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হাফিজা আক্তার জানান, বিগত ১৭ বছর তারা নিজেরাই মামলা-হামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়ে ফেরারি জীবন যাপন করেছেন, যে কারণে কে কোন দলের সাথে যুক্ত ছিল তা নিখুঁতভাবে নজরে রাখা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, “নাজমা আলম বিগত কিছুদিন যাবৎ আমাদের সাথে দলীয় কর্মকাণ্ডে আসছিলেন এবং ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে তার এমন অতীত বা ছবি রয়েছে, তা আমাদের জানা ছিল না। ফেসবুকে বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে পরামর্শক্রমে এবং তাদের নির্দেশেই আমরা কমিটিটি স্থগিত করেছি।”

এদিকে, স্থগিত কমিটির বিষয়ে নাজমা আলমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। গত ৩ নভেম্বর রাতে যখন তার হাতে কমিটির অনুমোদনপত্র তুলে দেওয়া হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার স্বামী হার্ট অ্যাটাক করেন। তখন থেকেই তিনি স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে নাজমা আলম বলেন, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সেসব অনুষ্ঠানে অতিথিদের সাথে তোলা ছবিই এখন উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে কমিটি স্থগিতের বিষয়েও তিনি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।

নাজমা আলমের দাবি, জেলা মহিলা দলের সভাপতি রোকসানা কানিজ চৌধুরী (পলমল) তাকে (নাজমা) ফোনে জানিয়েছেন, তিনি (পলমল) কমিটি স্থগিতের চিঠিতে কোনো স্বাক্ষর করেননি এবং কাউকে বরখাস্তও করেননি। সাধারণ সম্পাদক এককভাবে কীভাবে এটি করলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজমা আলম।

স্থানীয় রাজনীতি সচেতন মহলের মতে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে কোনো নেতার অতীত ইতিহাস লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। মুহূর্তেই স্থিরচিত্র বা অডিও-ভিডিওর কল্যাণে উন্মোচিত হচ্ছে রাজনৈতিক পালাবদলের আসল রূপ। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন না করে, হঠাৎ ভোল পাল্টানো ব্যক্তিদের পদায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, নেত্রকোনা পৌর মহিলা দলের ঘটনাই তার বড় একটি দৃষ্টান্ত।

তবে দ্রুততম সময়ের মাঝে তৃণমূলের সেন্টিমেন্ট বুঝতে পেরে একদিনের ব্যবধানেই বিতর্কিত কমিটি স্থগিত করায় জেলা মহিলা দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সাধুবাদও জানাচ্ছেন অনেকে। সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা, আগামী দিনে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় হাইকমান্ড আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version