রবিবার, নভেম্বর ১

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় নেত্রকোনা শহরের বুক চিরে বয়ে চলা মগড়া নদীর স্বচ্ছ জলে স্নান না করলে দিনই যেন শুরু হতো না শহরবাসীর। কিন্তু কালের নির্মম বিবর্তনে, দখল আর দূষণে সেই প্রমত্তা স্রোতস্বিনী আজ পরিণত হয়েছে কেবলই স্মৃতির কঙ্কালে। প্রিয় নদীর এই মুমূর্ষু আর বিবর্ণ রূপ সইতে না পেরে অভিমানী কবি হেলাল হাফিজ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি আর নেত্রকোনায় ফিরবেন না। কবির সেই দীর্ঘ অভিমান ভাঙাতে এবং শহরের প্রাণ মগড়াকে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিতে অবশেষে শুরু হয়েছে এক মহাযজ্ঞ।

কাগজের ফাইল আর প্রতিশ্রুতির গণ্ডি পেরিয়ে এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে অ্যাকশনে যাচ্ছে প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার (১ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী ও ফলপ্রসূ স্টেকহোল্ডার মতবিনিময় সভা। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) যৌথ আয়োজনে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল- ‘মগড়া নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রকল্প’-এর আওতায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি এবং রাজস্ব) মুন মুন জাহান লিজার সঞ্চালনায় এবং জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবেগমথিত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিশ্বের খুব কম শহরেই এমন নৈসর্গিক চিত্র দেখা যায়, যেখানে একটি নদী সাপের মতো পেঁচিয়ে পুরো শহরকে এত সুন্দরভাবে জড়িয়ে রেখেছে। ২০-২৫ বছর আগের মগড়ার ছবির সাথে আজকের চিত্র মেলালে আমাদের লজ্জিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।” দখলদারদের কারণে শহরে তীব্র যানজট এবং মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিবেশ না থাকার কথাও আক্ষেপের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

উচ্ছেদ অভিযানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা ঘোষণা করে সংসদ সদস্য জানান, মগড়া উদ্ধারে কোনো দলীয় বা পেশিশক্তির প্রভাব বরদাশত করা হবে না। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তিনি কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন- আগামী সাত দিনের মধ্যে পৌরসভা ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নদীর পাড়ের প্রাচীন ঘাটগুলো দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হবে। সিএস জরিপ ও নদীর বর্তমান প্রবাহকে প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত সীমানা নির্ধারণ ও পিলার বসানো হবে। বৈধ কাগজবিহীন স্থাপনা তাৎক্ষণিক ভেঙে ফেলা হবে। নদী ঘেঁষে থাকা বিতর্কিত জমিতে নতুন করে নামজারি ও ক্রয়-বিক্রয় সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। ভবিষ্যতে নদীর দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে, সংযোগ সেতু এবং সেতুগুলোকে দুই লেনে উন্নীত করা হবে।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান মগড়াকে ইংল্যান্ডের টেমস বা নিউইয়র্কের হাডসন নদীর সঙ্গে তুলনা করে এর ভৌগোলিক অনন্যতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “প্রকল্পটির আর মাত্র এক বছর সময় বাকি। তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে টিমওয়ার্কের ভিত্তিতে আমরা মগড়াকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনব।”

‘বাঙালি কেবল আলোচনাই করতে ভালোবাসে’- প্রচলিত এই প্রবাদ ভেঙে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম। তিনি পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রমে সর্বাত্মক নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

সভায় পরিবেশবাদী সংগঠন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, নেত্রকোনার ১১৫টি নদীর মধ্যে ১০০টিই আজ বিলুপ্ত। ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগড়ার পাড়ে ৮৩টি গ্রাম থাকলেও দখলদারিত্বের থাবা মূলত শহরেই সীমাবদ্ধ। এই নদী সচল থাকলে বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতো বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জেলা ছাত্রদলের সভাপতি অনিক মাহবুব চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরের মুক্তারপাড়া থেকে তেরিবাজার পর্যন্ত নদী গিলে ফেলা হয়েছে এবং বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি নদীতে পড়ছে। অতীতে শুধু গরিবের বস্তি উচ্ছেদ হলেও রাঘববোয়ালদের ভবন অক্ষত থাকার চিত্র তুলে ধরে এবার উচ্ছেদ অভিযান প্রভাবশালীদের ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’ থেকে শুরুর জোর দাবি জানান তিনি।

নদীতে অবৈধ দখলদারদের পাশাপাশি কিছু জটিলতার কথাও উঠে আসে। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের পক্ষে জেলা প্রেস ক্লাবের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাজমুস শাহাদাৎ নাজু এবং নাগড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল বাশার ফারাজী হাদী বলেন, যারা বিগত ৪৭-৪৮ বছর আগে সরকারের আরএস ও বিআরএস রেকর্ড অনুযায়ী রাজস্ব দিয়ে জমি কিনেছেন, তাদের যেন ঢালাওভাবে ‘ভূমিদস্যু’ বলে অপদস্থ করা না হয়। তারা ২০০৯ সালের হাইকোর্টের রিট অনুযায়ী সিএস ও আরএস জরিপের সমন্বয়ে ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানান। নদীর স্বার্থে নিজেদের এক ছটাক জমিও না রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তারা।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আশ্বস্ত করে বলেন, আরএস বা বিআরএস জরিপের অসঙ্গতির কারণে যারা বৈধভাবে জমির মালিক হয়েছেন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সবার সহযোগিতায় সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৪৮ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় মগড়ার ৪১ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং সদর ও আটপাড়া উপজেলার ৩০ কিলোমিটার এলাকায় উচ্ছেদ, কচুরিপানা ও বর্জ্য অপসারণ করা হবে। ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ হলে নাব্যতা ও বাস্তুতন্ত্র ফেরার পাশাপাশি বন্যার ক্ষতি থেকে বাঁচবে প্রায় ৫ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য।

সভায় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক এ কে এম আব্দুল্লাহ বিন রশিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সব সংশয়, আতঙ্ক আর দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে মগড়া নদী আবারও তার প্রাণ ফিরে পাবে, শহরের বুকজুড়ে বইবে নির্মল বাতাস- এমনটাই এখন সর্বস্তরের নেত্রকোনাবাসীর প্রাণের প্রত্যাশা।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version