শনিবার, অক্টোবর ৩১

রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)

বাবাকে হারানোর পর শৈশবেই থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। মেধা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক সংকটে ছেড়ে দিতে হয়েছিল বই-খাতা। এরপর সংসার, স্বামী-সন্তান আর পরিবারের দায়িত্ব পালনে কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু মনের ভেতর চাপা পড়ে থাকেনি শিক্ষার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের টানেই ৪৮ বছর বয়সে আবার শুরু করেন পড়াশোনা। দীর্ঘ চার বছরের অধ্যবসায় শেষে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন শেফালী বেগম। তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বয়স ও প্রতিকূলতাকে জয় করে নতুন করে স্বপ্ন দেখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা শেফালী বেগম। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেছেন তিনি। গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন শেফালী।

শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সম্ভাবনাময়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল আরও দূর এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক সংকটে সেই স্বপ্নে ছেদ পড়ে। একসময় পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের বাস্তবতা সামলাতে হয় তাঁকে। পরবর্তী সময়ে বিয়ে, সংসার ও তিন সন্তানের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজের শিক্ষাজীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও হয়ে ওঠেনি দীর্ঘদিন।

তবে বয়স বাড়লেও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাননি তিনি। মনের মধ্যে জমে থাকা সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস জোগান স্বামী ও সন্তানেরা। তাঁদের উৎসাহে ৪৮ বছর বয়সে আবারও বই-খাতা হাতে নেন শেফালী। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, সংসারের ব্যস্ততা এবং বয়সের ব্যবধান—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা। নিয়মিত পড়াশোনা ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে অবশেষে ধরা দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।

শেফালীর বড় ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্য আমাদের পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। আমি চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করুন।”

মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতেও শেফালীর এই অর্জন ব্যতিক্রমী। গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।”

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, “ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, “শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।”

পরিবারের নতুন প্রজন্মের কাছেও শেফালী এখন অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি চিকিৎসক হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”

একসময় যে নারী পারিবারিক বাস্তবতার কাছে নিজের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তিনিই আজ পরিবারের সন্তান ও নাতনির কাছে হয়ে উঠেছেন শিক্ষার অনুপ্রেরণা। তাঁর এই অর্জন মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কেবল বয়সনির্ভর কোনো অর্জন নয়; এটি ইচ্ছা, সুযোগ ও অধ্যবসায়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক নিরন্তর যাত্রা।

৪৮ বছর বয়সে নতুন করে শুরু, আর ৫২ বছর বয়সে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.২১—শেফালী বেগমের এই পথচলা তাই কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সেই সব মানুষের জন্য আশার বার্তা, যাঁদের পড়াশোনা কোনো না কোনো কারণে মাঝপথে থেমে গেছে। তাঁর জীবন যেন বলে, স্বপ্ন পূরণের জন্য বয়স কোনো শেষ সীমা নয়; ইচ্ছাশক্তি থাকলে জীবনের যেকোনো সময়েই নতুন করে শুরু করা যায়।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version