নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষার মান নিয়ে উত্থান-পতন দেখার সুযোগ আমাদের প্রায় সকলেরই হয়েছে। তবে সদ্য প্রকাশিত নেত্রকোনা জেলার এইচএসসি পরীক্ষা-২০২৬ এর ফলাফল যেন হাওরবেষ্টিত এই জনপদের শিক্ষাব্যবস্থার এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। জেলা শিক্ষা অফিসের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় এবার সার্বিক পাসের হার মাত্র ৪৩.৯১ শতাংশ। অর্থাৎ, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী এবার সাফল্যের দেখা পায়নি।
ফলাফলের সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো জেলায় ১৩ হাজার ৮৮৯ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৩ জন, আর অকৃতকার্য হয়েছে বিশাল অংশ, যার সংখ্যা ৮ হাজার ৭৬ জন। মেধার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও বেশ হতাশাজনক; পুরো জেলার ১০টি উপজেলা মিলিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৭০ জন শিক্ষার্থী।
উপজেলাভিত্তিক ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ রয়েছে কেবল নেত্রকোনা সদর উপজেলায়। সদরে ৪ হাজার ৫৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৩০৫ জন পাস করেছে, যার পাসের হার ৫২.৬৮ শতাংশ। জেলার ৭০টি জিপিএ-৫ এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ ৪৬টিই অর্জন করেছে সদরের শিক্ষার্থীরা। এর বাইরে কেন্দুয়া উপজেলায় ১ হাজার ৫৮৫ জনের মধ্যে ৭৮৪ জন পাস করেছে, পাসের হার ৪৯.৪৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ জন। খালিয়াজুরীতে পাসের হার ৪৮.৮৯ শতাংশ (জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন)। পূর্বধলা উপজেলায় ১ হাজার ৯৮৮ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৭৪২ জন (পাসের হার ৩৭.৩৮%) এবং সদরের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে পূর্বধলা উপজেলা থেকে।
অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি উপজেলার ফলাফল অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীদের কপালে রীতিমতো চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বারহাট্টা উপজেলায় পাসের হার জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন, মাত্র ৩০.২০ শতাংশ। সেখানে ৮৬৪ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৬১ জন। আটপাড়ায় পাসের হার ৩১.৫৭ শতাংশ এবং মদনে ৩২.১২ শতাংশ। অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, জেলার বারহাট্টা, আটপাড়া এবং কলমাকান্দা- এই তিন উপজেলার কোনো শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ এর দেখা পায়নি।
তবে ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও অন্ধকার দিকটি হলো শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা। জেলার তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই এবার এইচএসসি বৈতরণী পার হতে পারেনি। শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো- কেন্দুয়া উপজেলার গোপালপুর মডেল কলেজ, কলমাকান্দা উপজেলার কলমাকান্দা মহিলা কলেজ এবং পূর্বধলা উপজেলার খলিশাপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদের দেওয়া পরিসংখ্যানে আমাদের সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কেন তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন চরম বিপর্যয় ঘটল, কেন জেলার সার্বিক পাসের হার পঞ্চাশ শতাংশের নিচে এবং কেনই বা জিপিএ-৫ এর আকাল- তা নিয়ে এখন শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের নিবিড় পর্যালোচনার সময় এসেছে। প্রান্তিক জনপদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা না নিলে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।




