কেন্দুয়া প্রতিনিধি: সমাজে যাদের পথপ্রদর্শক হওয়ার কথা, সেই জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারাই বসেছিলেন জুয়ার আসরে। গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এমন এক আসরে হানা দিয়ে দুই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যসহ ছয়জনকে আটক করেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানা পুলিশ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার গন্ডা বাজারের একটি দোকানঘর থেকে তাদের হাতেনাতে আটক করা হয়। এ সময় জব্দ করা হয় নগদ টাকা ও জুয়া খেলার সরঞ্জাম।
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মাদক উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অভিযানে বের হয় কেন্দুয়া থানা পুলিশের একটি দল। উপপরিদর্শক (এসআই) খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে দলটি বুধবার ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে সাহিদপুর বাজার এলাকায় অবস্থান করছিল। ঠিক তখনই খবর আসে, গন্ডা বাজারে মোস্তফা নামের ব্যক্তির দোকানে টাকার বিনিময়ে তাসের জমজমাট জুয়া চলছে।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানানো হয়। তার নির্দেশ পেয়ে ভোর সোয়া ৪টার দিকে পুলিশ ওই দোকানটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসরে থাকা জুয়াড়িরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। ঘটনাস্থল থেকেই ছয়জনকে আটক করে পুলিশ।
আটক হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কারণ, তাদের মধ্যে রয়েছেন গন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান দুই ইউপি সদস্য। তারা হলেন- হাফিজুর রহমান ওরফে খোকন (৬০) এবং আলী ওসমান (৪২)।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান খোকন ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য এবং আলী ওসমান আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আটক বাকি চারজনও একই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন গন্ডা চর গ্রামের খুররম মিয়া (৫০), মনকান্দা গ্রামের চান্দু মিয়া (৪৫), বীরমহুরী গ্রামের সোহাগ (৪৫) এবং মরিচপুর গ্রামের মজিবুর রহমান (৬০)। স্থানীয়রা জানান, এদের মধ্যে সোহাগ উপজেলা বিএনপির এবং খুররম মিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য। খুররম আবার ইউনিয়ন যুবদলের এক সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়কের আপন বড় ভাই। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বয়সের ব্যবধান থাকলেও জুয়ার টেবিলে তারা সবাই একজোট হয়েছিলেন।
অভিযানের সময় ওই দোকানঘরের টেবিল থেকে ১০৪টি তাস এবং নগদ ১০ হাজার টাকা জব্দ করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে তাস দিয়ে জুয়া খেলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
কেন্দুয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম পুরো অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জুয়া খেলার খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিক সেখানে পুলিশ পাঠাই। ঘটনাস্থল থেকে সরঞ্জামসহ তাদের হাতেনাতে আটক করা হয়। এ ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে সদ্য প্রণীত ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর ৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবারই তাদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে।”
জনপ্রতিনিধিদের এমন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার খবরে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে গন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম কল্যাণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “মাদক ও জুয়া নির্মূলে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছি। আমার জানামতে, আমার ইউপি সদস্যদের এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা নয়। তারপরও যেহেতু তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন, এখন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং আইন অনুযায়ী যা হওয়ার, তা-ই হবে।”




