সোমবার, অক্টোবর ২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: হাওরাঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখের চিরচেনা সাথী ধনু নদ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই নদের বুকে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার হাজারো মৎস্যজীবী। নদের বুক চিরেই দেশের নানা প্রান্তে ছুটে চলে পণ্যবাহী নৌযান। কিন্তু হাওরের পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথেই বদলে গেছে চিরচেনা সেই দৃশ্যপট। এখন নদের বুকজুড়ে কেবলই বাঁশ আর জালের অবৈধ বেষ্টনী। প্রভাবশালীদের তৈরি করা মাছের ঘেরে আজ রুদ্ধ হতে চলেছে ধনু নদের স্বাভাবিক প্রবাহ, আর সেই সাথে নিভে যেতে বসেছে সাধারণ জেলে পরিবারের রান্নার উনুন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, খালিয়াজুরীর লেপসিয়া থেকে শুরু করে গাজীপুর ইউনিয়নের পাঁচহাট পর্যন্ত ধনু নদের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ঘেরমালিকদের দখলে। প্রতিবছর বর্ষা শেষে হাওরের পানি যখন নামতে শুরু করে, তখনই শুরু হয় নদী দখলের অঘোষিত প্রতিযোগিতা। নদীর দুই পাড় থেকে শুরু হওয়া বাঁশ ও জালের বিশাল বেড়া চলে গেছে একেবারে মাঝনদী পর্যন্ত। দেখলে মনে হয়, উন্মুক্ত প্রবহমান কোনো নদ নয়, বরং ব্যক্তিগত পুকুরে রূপ নিয়েছে ধনু।

নুরালীপুর গ্রামের প্রান্তিক জেলে রহিছ, রাকিব ও জিলকদ মিয়ার চোখেমুখে এখন কেবলই হতাশার ছাপ। বংশপরম্পরায় নদীতে মাছ ধরেই তাঁদের সংসার চলে। নিজেদের আক্ষেপের কথা জানিয়ে তাঁরা বলেন, বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরতে গেলে ইজারাদারদের বাধার মুখে পড়তে হয়। আশায় থাকেন, পানি কমলে উন্মুক্ত নদীতে জাল ফেলে দুটো ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করবেন। এখন সেই পথও বন্ধ। নদীতে মাছ ধরতে নামলেই তেড়ে আসেন ঘেরমালিকদের লোকজন। কেবল বাধাই নয়, অনেক সময় শারীরিক নির্যাতন ও মারধরেরও শিকার হতে হয় নিরীহ এই জেলেদের।

খালিয়াজুরী সদরের এক বৃদ্ধ জেলে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই। এখন নদীতে মাছ ধরতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চললে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঁচব কীভাবে? আমাদের কথা শোনার কেউ নেই।” জেলেদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বা স্থানীয় ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, মুখ বদলায়, কিন্তু নদী দখলের চিত্র বদলায় না। একের পর এক প্রভাবশালী মহল এসে নদীতে আধিপত্য বিস্তার করে, আর বরাবরের মতোই বঞ্চিত থেকে যান প্রকৃত মৎস্যজীবীরা।

ধনু নদ কেবল মাছের উৎস নয়, এটি ভাটি অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক নৌপথ। প্রতিদিন এই নদ দিয়ে বাল্কহেড ও কার্গোসহ অসংখ্য পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করে। বর্তমানে মাঝনদী পর্যন্ত বিস্তৃত বাঁশের খুঁটি ও জালের ঘেরের কারণে নৌ চলাচল এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

এই নৌপথে নিয়মিত চলাচলকারী জাহাজ ‘এমভি সৌরভ’-এর সারেং মো. সুলাইমান সওদাগর তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, নদীর দুই পাড় থেকে ঘেরের বেড়া এতটাই ভেতরে চলে এসেছে যে, মাঝনদী দিয়ে বড় পণ্যবাহী নৌযান চালানো দায় হয়ে পড়েছে। বাঁশের খুঁটির সাথে ধাক্কা লেগে কিংবা প্রপেলারে জাল পেঁচিয়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে তাদের জাহাজ চালাতে হচ্ছে।

কোনো নিয়মনীতি বা আইনের তোয়াক্কা না করেই কীভাবে প্রবহমান নদীতে এমন স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে, তা জানতে কথা হয় আসদপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ঘেরমালিক হোসেন মিয়ার সাথে। নদীতে ঘের দেওয়ার বিষয়টি তিনি অকপটেই স্বীকার করেন। যুক্তি হিসেবে তার সরল জবাব- বাড়ির সামনে নদী, তাই প্রতিবছরই তিনি ঘের দেন।

প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে হোসেন মিয়া বলেন, “নিজের ইচ্ছাতেই দিয়েছি।” এতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টিও তার কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তার ভাষ্য, “আমি ছাড়া আরও মানুষ দেয়, আমিও দিয়েছি।”

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি উঠে আসে ঘের পরিচালনার নেপথ্যের সমীকরণ জানতে চাইলে। ঘের টিকিয়ে রাখতে কাউকে টাকা দিতে হয় কি না- জানতে চাইলে হোসেন মিয়া দাবি করেন, টাকা দিতে না হলেও মাছ ধরার সময় নৌ-পুলিশের লোকজন আসেন এবং তাদের মাছ দিয়ে দিতে হয়। তবে অন্যান্য ঘেরমালিকদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে এই নদী দখলের মহোৎসব। আসদপুর গ্রামের আরেক বাসিন্দা মো. তোফাজ্জল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে ঘের দেওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নাব্যতা হারানোর পাশাপাশি পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। এমনকি খোদ লেপসিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে ঘের তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি উপজেলা প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০’ এবং ‘মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫’ অনুযায়ী প্রবহমান জলাশয়ে এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি সম্পূর্ণ বেআইনি। বিধিমালার সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো নদ-নদী, খাল বা বিলে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে আড়াআড়ি বাঁধ বা স্থায়ী-অস্থায়ী কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ফাঁড়ির সামনে ঘের নির্মাণ এবং ঘেরমালিকদের কাছ থেকে মাছ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লেপসিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জগত জ্যোতি চৌধুরী স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তবে অচিরেই এসব ঘেরের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।” নৌ-পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে আপনারা নিউজ করে দেন।”

অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, দাপ্তরিকভাবে কেউ অভিযোগ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে বিষয়টি তার নজরে এসেছে।

নদীতে ঘের ও নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার বিষয়ে ইউএনও বলেন, “নদীর গতিপথ অনেক সময় পরিবর্তিত হয়। ঘেরের জায়গাগুলো জলমহালের অংশ কি না, তা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” লেপসিয়া থেকে পাঁচহাট পর্যন্ত বিস্তৃত অবৈধ ঘেরগুলো চিহ্নিত করে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই ও অভিযানের আশ্বাস মিলেছে। তবে খালিয়াজুরীর সাধারণ মানুষ ও জেলেরা কেবল আশ্বাসের বাণীতে আর ভরসা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, মৎস্য সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে ধনু নদকে দ্রুত অবৈধ ঘেরমুক্ত করা হোক। পাশাপাশি অবৈধ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো অনিয়ম বা প্রভাব খাটানোর ঘটনা থাকলে তা তদন্ত করে বের করা হোক। ধনু নদ আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে পাবে, পণ্যবাহী নৌযান চলবে নির্বিঘ্নে, আর জেলেরা আবার হাসিমুখে জাল ফেলবেন উন্মুক্ত জলে-এমনটাই প্রত্যাশা খালিয়াজুরীবাসীর।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version