নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী জনপদ কলমাকান্দা। প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র্যের বাইরে এই জনপদে নিপুণ হাতে বোনা জামদানির সূক্ষ্ম সুতোর কারুকাজেও সমৃদ্ধ, তা হয়তো অনেকেরই অজানা ছিল। সেই নিভৃতচারী ও দক্ষ কারিগরদের জীবনে এবার বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের নতুন হাওয়া। দীর্ঘদিনের মহাজনি প্রথা আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের শিকল ভেঙে এই জনপদে বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠতে যাচ্ছে ‘কলমাকান্দা জামদানি পল্লী’। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে প্রান্তিক কারিগরদের স্বপ্ন এখন বাস্তব রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া আবেগঘন ও প্রেরণাদায়ী পোস্টে এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন ডেপুটি স্পিকার। তার এমন ঘোষণার পর থেকেই পুরো কলমাকান্দা জুড়ে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন ও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
পোস্টে তিনি নিজেই শুরুতে অবাক হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কলমাকান্দার মতো প্রান্তিক এলাকার কারিগরদের জামদানির দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি লেখেন, “জামদানি শাড়ি!! জ্বি, বলছি কলমাকান্দার জামদানি শাড়ির কথা, প্রথমে আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম যে আমাদের কলমাকান্দায় জামদানি শাড়ির দক্ষ কারিগরগণ ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শাড়ি সরবরাহ করছেন।”
তবে এই নিপুণ শিল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিদারুণ এক বঞ্চনার চিত্রও তিনি তুলে ধরেন। নিজস্ব পুঁজি না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এসব কারিগর বাধ্য হচ্ছিলেন মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে। ফলে তাদের হাতের ছোঁয়ায় বোনা শাড়ি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাদৃত হলেও, কারিগরদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছিল না।
কারিগরদের নীরব সংগ্রাম অনুধাবন করে তাদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। গত দুই-তিন মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সাথে প্রান্তিক কারিগরদের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তার প্রচেষ্টার সফল পরিণতি হিসেবে সম্প্রতি ১২টি ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় জামদানি কারিগরদের নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের সাফল্যের কথা জানিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি অত্যন্ত স্বস্তির সাথে উল্লেখ করেন, “আশার কথা হলো গত দুই-তিন মাসের প্রচেষ্টার পর আজ ১২টি ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং কারিগরদের নিয়ে বৈঠকের পর বলতে পারছি, আমাদের কারিগরগণ আর মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারস্থ হতে হবে না।”
মূলত ব্যাংকগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততার ফলে কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির পথ সুগম হলো, যা কুটির শিল্পকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডেপুটি স্পিকার জানান, বৃহৎ আকারে ‘কলমাকান্দা জামদানি পল্লী’ গড়ে তোলা এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই উন্নয়ন যাত্রায় শামিল হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন একসাথে কাজ করি- সবাই মিলে মানবিক, উন্নত কলমাকান্দা গড়ে তুলি।”
ডেপুটি স্পিকারের এমন সময়োপযোগী ঘোষণার পর স্থানীয় চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সুধীসমাজ- সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে জামদানি পল্লী। দীর্ঘদিনের শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কারিগরদের চোখেমুখে এখন কেবলই এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। যে সুতোয় একদিন বোনা হতো কেবলই টিকে থাকার সংগ্রাম, সেই সুতোয় এখন বোনা হচ্ছে অর্থনৈতিক মুক্তি আর আত্মমর্যাদার রঙিন ভবিষ্যৎ।




