সোমবার, অক্টোবর ১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক: সামরিক জীবনের কঠোর শৃঙ্খলা আর সাংবাদিকতার অদম্য সাহসিকতা- এই দুইয়ের এক বিরল মেলবন্ধন ছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা মাদক কারবার, চোরাচালান আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। আর এই সাহসিকতাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো তার জন্য। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘাতকের ছোঁড়া ছয়টি গুলিতে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে দুর্নীতিবিরোধী এই কলমযোদ্ধার কণ্ঠ।

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ ফকিরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্যতম আসামি সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে (২৮) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এই আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।

পেশায় সাংবাদিক হলেও লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাবেক সদস্য। তিনি বেসরকারি আইপি টিভি ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। এই পেজের মাধ্যমেই এলাকার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত লেখালেখি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন আলিফ, যা তাকে খুব দ্রুতই অপরাধীদের চক্ষুশূলে পরিণত করেছিল।

আলিফের পৈতৃক নিবাস কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে হলেও, তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সোয়া আটটার কাছাকাছি। দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকার শ্বশুরবাড়ি সংলগ্ন একটি দোকানে নিজের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোনটি আনতে গিয়েছিলেন আলিফ। তিনি জানতেন না, অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘাতকরা সেখানেই তার জন্য ওঁত পেতে আছে। দোকানে পৌঁছাতেই তাকে লক্ষ্য করে একে একে ছয়টি গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অকুতোভয় এই সাংবাদিক। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

স্বামীর এমন আকস্মিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডে শোকস্তব্ধ আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। স্বামীকে হারানোর বেদনার মাঝেই শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিনি বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৭-৮ জনকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই, শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে পৌর শহরের মধ্যবাজারের সিনেমা হল এলাকা থেকে পুলিশের জালে ধরা পড়ে অপূর্ব। গ্রেপ্তারকৃত অপূর্ব দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে।

গ্রেপ্তার হওয়া অপূর্বর রয়েছে এক ভয়ংকর অপরাধের অতীত। জানা যায়, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুরে ছুটিতে আসা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই চাঞ্চল্যকর পুলিশ হত্যা মামলায় ১৩ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সে আইনের ফাঁক গলে জামিনে বেরিয়ে আসে এবং আবারও অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার পর এবার একজন সাংবাদিককে হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় জনমনে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুর্গাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে রিমান্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ।

সোমবার দুপুরে রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত আসামির ২৪ ঘণ্টার (এক দিন) রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিন দুপুর ২টা থেকে আগামীকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টা পর্যন্ত তাকে পুলিশি হেফাজতে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সমাজের সকল স্তরের মানুষ আজ তাকিয়ে আছে এই তদন্তের দিকে। যে মানুষটি কলম হাতে সমাজের অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিলেন, তার নির্মম পরিণতির সুষ্ঠু বিচার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পুলিশ জানিয়েছে, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে। সত্য বেরিয়ে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা দুর্গাপুরবাসীর।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version