নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুরের আকাশ-বাতাস যেন আজও ভারী হয়ে আছে নির্মম এক শোকের ভারে। যে কলম কথা বলতো সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে, যে কণ্ঠ সোচ্চার ছিল সত্যের পক্ষে, তাকে চিরতরে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বুলেটের আঘাতে। দুর্বৃত্তের নির্মমতায় নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের ওরফে আলিফ ফকির রক্তাক্ত বিদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মী ও সাধারণ মানুষ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাই রাজপথে নেমে এসেছেন তারা। তাদের কণ্ঠে এখন জোরালো দাবি- আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আলিফের খুনিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সামনের মোড় রূপ নিয়েছিল প্রতিবাদী জনসমুদ্রে। কেবল কলমযোদ্ধারাই নন, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ছুঁয়ে গেছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে। দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা একাত্মতা ঘোষণা করে অংশ নেন। তাদের চোখেমুখে যেমন ছিল স্বজন হারানোর শূন্যতা, তেমনি ছিল বিচারহীনতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ।
সনাতন ধারার খবর পাঠের বাইরে গিয়ে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এটি শুধু মানববন্ধন ছিল না; এটি ছিল মুক্ত সাংবাদিকতার পক্ষে সম্মিলিত এক আর্তনাদ। দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুম বিল্লাহর সঞ্চালনায় এবং সহ-সভাপতি মো. মোহন মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে হারিয়ে আবেগাপ্লুত বক্তব্য রাখেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।
প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এস এম রফিকুল ইসলাম রফিক রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “এত বড় মর্মান্তিক ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত জড়িত কেউ আটক হয়নি, যা আমাদের চরমভাবে হতাশ করে। আমরা সরকার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্পষ্ট দাবি জানাচ্ছি, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিচারকার্য নিশ্চিত করতে হবে।”
আরেক প্রবীণ সাংবাদিক নির্মলেন্দু সরকার বাবুলের কণ্ঠেও ছিল কঠোর হুঁশিয়ারি। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশাসন এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হলে সাংবাদিক সমাজ বৃহত্তর ও কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
তবে উপস্থিত সবার হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর দাগ কেটেছে যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার কামাল হোসাইনের বক্তব্য। সাংবাদিকতার ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “সত্য প্রকাশের অপরাধে আমাদের সহকর্মী আলিফ ফকিরের বুক ঝাঁঝরা করা হয়েছে ছয়টি গুলি দিয়ে। চোরাচালানের মতো অপরাধের সত্য তুলে ধরতে গিয়ে যদি তাকে শহীদ হতে হয়, তবে আমরা প্রত্যেকটা সাংবাদিক শহীদ হতে প্রস্তুত। তবুও মৃত্যুভয় দেখিয়ে কলম থামানো যাবে না; আমরা সত্য প্রকাশ করেই যাব।” তিনি প্রশাসনকে ইঙ্গিত করে আরও বলেন, এলাকার চোরাচালান চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত, তা পুলিশের অজানা নয়। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই চক্রকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি পল্লব চক্রবর্তী, প্রবীণ সাংবাদিক ধনেশ পত্রনবিস, সাংবাদিক সমিতির সভাপতি দিলওয়ার হোসেন তালুকদারসহ স্থানীয় আরও অনেক গণমাধ্যমকর্মী।
মানববন্ধন শেষে সাংবাদিকরা রাজপথে বসে দীর্ঘ সময় বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তাদের নীরব অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ শুধু একজন আলিফ ফকিরের হত্যার বিচার চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে মুক্ত গণমাধ্যম, নাগরিক নিরাপত্তা ও সত্যের পক্ষে এক অভিন্ন লড়াই।
দুর্গাপুরের আপামর জনসাধারণ এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে। তারা দেখতে চায়, কলমের কালিকে যারা বুলেটের বারুদ দিয়ে স্তব্ধ করতে চায়, রাষ্ট্র তাদের কতটা দ্রুত বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচারই পারে সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।




