শনিবার, অক্টোবর ১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক: কলম সৈনিকের কাজ সমাজকে আলোকিত করা, অপরাধের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরা। সেই সত্য তুলে ধরতে গিয়ে যদি কলমের বদলে বুলেট উপহার পেতে হয়, তবে তা সমগ্র জাতির জন্যই অশনি সংকেত। ঠিক এমনই মর্মান্তিক ও পৈশাচিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলা। মাদক ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কলম ধরার অপরাধে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক লুৎফুর জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকিরকে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বেলা ১১টায় এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ফাঁসির দাবিতে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথাগত খবরের গণ্ডি পেরিয়ে এ মানববন্ধন যেন হয়ে উঠেছিল সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের ঐক্যের মঞ্চ, যেখানে শুধুই শোক নয়, বরং ফুটে উঠেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ।

‘নেত্রকোনা সাংবাদিক সমাজ’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশ নেন। সাংবাদিক সঞ্জয় সরকারের সঞ্চালনায় এই প্রতিবাদ সমাবেশে উঠে আসে গণমাধ্যমকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার চরম বাস্তব চিত্র।

মানববন্ধনে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‍“সাংবাদিক লুৎফুর শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রান্তিক জনপদের একজন অতন্দ্র প্রহরী। তার আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে কুচক্রী মহল কতটা মরিয়া।” তিনি অবিলম্বে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে এটিকে গ্রহণ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট প্রদান এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তিনি সাংবাদিকদের মধ্যে সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যের ডাক দেন।

দুর্গাপুরের উৎরাইল বাজারে জনবহুল এলাকায় পরপর পাঁচ-ছয়টি গুলি করে একজন কলমযোদ্ধাকে হত্যা করা হলেও তিন দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও খুনিরা অধরা। এ বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল আক্ষেপের সুরে বলেন, “অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, সারা দেশে হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও, ঘটনার তিন দিন পরও পুলিশ কোনো আসামিকে চিহ্নিত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তাহলে প্রযুক্তি কার স্বার্থে?” একই সুরে কথা বলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের জেলা প্রতিনিধি আবুল কালাম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “জনপদের ভেতর এসে পাঁচ-ছয় রাউন্ড গুলি করে খুনিরা কীভাবে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়? এই অবৈধ অস্ত্র কাদের হাতে এবং প্রশাসন কেন তাদের ধরতে পারছে না?”

নিহত লুৎফুর জামান ফকির দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর জেলা প্রতিনিধি তানভীর হায়াত খান এবং প্রবীণ লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী জানান, এই নির্ভীক সাংবাদিককে মূলত সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিরাই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক প্রীতম মিয়া সোহাগ একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে মানুষটি সমাজের অন্যায়, মাদক ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে লিখছিলেন, তাকে বাঁচিয়ে রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল। মফস্বলে কাজ করা সাংবাদিকদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই, কোনো ওয়েজবোর্ড নেই। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।”

মানববন্ধনের সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন নিহত সাংবাদিকের অসহায় পরিবারের কথা উঠে আসে। সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল জানান, আলিফ ফকিরের বসতবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পরিবারটির আয়ের আর কোনো উৎস অবশিষ্ট নেই। তিনি সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সরকার যেন অবিলম্বে নিঃস্ব পরিবারটির আর্থ-সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তাদের সব ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।”

নেত্রকোনার এই মানববন্ধন শুধু একজন সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদ নয়, এটি মুক্তচিন্তা ও সত্য প্রকাশের অধিকার রক্ষার সম্মিলিত আর্তনাদ। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম যদি এভাবে হুমকির মুখে পড়ে, তবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও অপরাধ বাসা বাঁধতে সময় লাগবে না।

উপস্থিত সকল সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকের দাবি- অনতিবিলম্বে সাংবাদিক আলিফ ফকিরের খুনিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নতুবা, কলম ছেড়ে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলনের যে হুঁশিয়ারি আজ উচ্চারিত হয়েছে, তা গোটা দেশের সাংবাদিক সমাজকে আলোড়িত করবে। সত্যের মৃত্যু নেই, আর সেই সত্য প্রতিষ্ঠায় লুৎফুরের রক্ত যেন বৃথা না যায়- এটাই আজ নেত্রকোনাবাসীর প্রত্যাশা।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version