শুক্রবার, অক্টোবর ১৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা দুর্গাপুরের বিরিশিরি তেলুঞ্জিয়া এলাকার সেই চায়ের দোকানের পাশেই এখনো শুকায়নি ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। নিজের বাড়ি থেকে মাত্র একশো গজ দূরে যে মানুষটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত শব্দ বুনতেন, সেই কলম সৈনিকের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে এখানেই।

গতকল (বৃহস্পতিবার) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুই সশস্ত্র যুবকের পরপর ছোড়া ছয়টি বুলেটে প্রাণ হারান সাংবাদিক আলিফ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে তীব্র ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের নেতারা। ক্ষুব্ধ সাংবাদিক সমাজ প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার এবং ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে হবে। অন্যথায় নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাওসহ দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

শুক্রবার দুপুরে শোকাহত ওই এলাকায় আসেন বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক। তার সঙ্গে ছিলেন সংগঠনের পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) আলী আবিদ, ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রধান বিলাল হোসেন মানিক, কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশনের নেতা জামাল উদ্দিন এবং ময়মনসিংহ জেলা প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম।

রক্তাক্ত ঘটনাস্থল দেখিয়ে মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “এই জায়গাতেই সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একজন সাংবাদিককে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার চাই।”

সাংবাদিক আলিফের মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে অতীতে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার প্রসঙ্গ। দীর্ঘ অপেক্ষার এক আক্ষেপের নাম ‘সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড’। সেই প্রসঙ্গ টেনে মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “আলিফ হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে যেন সাগর-রুনির মতো বছরের পর বছর আমাদের অপেক্ষা করতে না হয়।”

তবে তিনি আশার আলো হিসেবে তুলে ধরেন গত বছর গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের কথা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সেই সময় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং গাজীপুর প্রশাসনের তৎপরতায় মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। নেত্রকোনা পুলিশ প্রশাসনের কাছেও ঠিক সেই একই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বেঁধে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে দেশব্যাপী কলম সৈনিকরা এক হয়ে নেত্রকোনা এসপি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।

আলিফের মূল বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামে। বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। তবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দুর্গাপুর পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন তিনি।

আইপিটিভি ‘রূপসী বাংলা’-এর নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে ফেসবুক পেজ চালাতেন আলিফ। সমাজকে পরিচ্ছন্ন করার অদ্ভুত নেশা ছিল তার। নিজের পেজে তিনি নিয়মিত এলাকার দুর্নীতি, অনিয়ম ও মাদকের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন। আর এই সততাই হয়তো কাল হলো তার জন্য।

গত বছরের ১০ নভেম্বরও দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তীরে তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে জখম করেছিল। তখন তার এক সহকর্মী বাঁচাতে এলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। বার বার আক্রোশের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিক নেতারা আলিফের প্রকাশিত প্রতিবেদন, ফেসবুক পোস্ট এবং পূর্বশত্রুতার বিষয়টি গভীরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

আলিফের মৃত্যুতে পথে বসতে চলেছে তার পরিবার। সাংবাদিক নেতাদের কণ্ঠে সেই উদ্বেগের সুর স্পষ্ট, “যে সাংবাদিক মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাকে যদি এভাবে প্রাণ দিতে হয়, তাহলে তার পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? আমরা চাই, রাষ্ট্র তার পরিবারের পাশে দাঁড়াক এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।”

দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ জানিয়েছেন, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। হত্যারহস্য উন্মোচনে নিবিড় তদন্ত চলছে।

অন্যদিকে নেত্রকোনা জেলার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম পুরো ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে ধারণা করছেন। তিনি জানান, হত্যাকারীদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা এবং অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। খুনিদের পালাতে বাধা দিতে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। দুর্গাপুরের রক্তাক্ত প্রান্তর আজ যেন পুরো সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে- সত্যের সন্ধানে থাকা কলম কি এভাবেই বুলেটের আঘাতে নিভে যাবে? আলিফের রক্তের ঋণ কি রাষ্ট্র শোধ করতে পারবে? এখন শুধু অপেক্ষার পালা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজপথের ভবিষ্যৎ চিত্র।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version