বুধবার, অক্টোবর ১৪

বিগত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তীব্র জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক আবাসস্থল বিনাশ এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন বিরূপ প্রভাবের কারণে বিশ্বের বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫২ বছরে বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে প্রায় ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য এক চরম বিপর্যয়।

বিশ্বব্যাপী এই আশঙ্কাজনক পতনের সমান্তরালে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বও এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ) এবং জুলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন (জেডএসএল) যৌথভাবে প্রকাশিত সর্বশেষ দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট ২০২৬’ এবং সম্প্রতি দেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যের যৌথ পর্যালোচনায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্বের ৫ হাজার ৭৯০টি মেরুদণ্ডী প্রজাতির বন্যপ্রাণীর প্রায় ৩৫ হাজার ৮০৩টির গতিপ্রকৃতি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করে এবারের ১৬তম প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

বৈশ্বিক সংকটের বিশদ পরিসংখ্যান ও বাস্তুতন্ত্র

ডব্লিউডব্লিউএফ-এর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে স্বাদু পানি বা মিঠা পানির প্রাণীকুল। বিগত ৫২ বছরে বিশ্বব্যাপী মিঠা পানির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার মূল কারণ নদী ও জলাভূমির অপরিকল্পিত বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ও লাগামহীন দূষণ। এছাড়া স্থলভাগের বন্যপ্রাণী ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক বন্যপ্রাণী কমেছে গড়ে ৫৯ শতাংশ।

আঞ্চলিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর সংখ্যার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে, যা গড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ। এরপরই রয়েছে আফ্রিকা অঞ্চল, যেখানে বন্যপ্রাণী কমেছে ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ সামগ্রিক এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই হ্রাসের হার গড়ে ৪৯ শতাংশ, যা ৭৮৭টি প্রজাতির ৪ হাজার ৬৬৪টি বন্যপ্রাণী দলের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিরূপিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও ৩১ প্রজাতির বিলুপ্তি

বৈশ্বিক এই মহাসংকটের সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃতিতেও। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) বাংলাদেশ এবং সরকারের বন বিভাগের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, গত কয়েক শতকে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হওয়া এই প্রজাতির মধ্যে ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি এবং ১টি সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী রয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে গ্রেটার ওয়ান-হর্নড গণ্ডার, এশিয়ান টু-হর্নড গণ্ডার, বন্য মহিষ, নীলগাই, জলাভূমির হরিণ এবং ধনেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী।

চরম ঝুঁকিতে এশীয় হাতি

প্রতিবেদনে এশিয়ার বনাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী বন্যপ্রাণী এশীয় হাতির চরম অস্তিত্ব সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বন বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে বন্য হাতির সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৬৮টি। তবে বাসস্থান ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার কারণে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাত্র ৯ বছরেই দেশে ১৪৬টি হাতি মারা গেছে।

ছবি : বাসস

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় জানান, অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ, খাদ্য সংকট এবং ফসলি জমিতে পাতা বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও দ্রুতগামী ট্রেনের সাথে সংঘর্ষের কারণে মানুষের সাথে হাতির দ্বন্দ্ব চরম রূপ নিয়েছে, যা এই প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মূল কারণ।

সুন্দরবনের বাঘ ও সংরক্ষণের আশার আলো

এই ব্যাপক সংকটের মাঝেও এবারের প্রতিবেদনটির মূল প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘দ্য সায়েন্স অব হোপ’ বা আশার বিজ্ঞান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের নজরদারি করা মোট বন্যপ্রাণী জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক এখনও স্থিতিশীল রয়েছে কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ছবি : সংগৃহীত

সরকারের কঠোর নজরদারি, চোরাশিকার বিরোধী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন ও প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ ব্যবস্থার ফলে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১২৫টিতে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী গণনায় ছিল ১১৪টি। বিশ্বব্যাপী বাঘের সংখ্যা ২০১০ সালের ৩ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে সম্প্রতি ৫ হাজার ৭০০-তে পৌঁছেছে। এই সফল প্রত্যাবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের টেকসই সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আইনি পদক্ষেপ

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীববৈচিত্র্যের এই নেতিবাচক ধারাকে ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে পুরোপুরি বদলে দিতে হলে খাদ্য উৎপাদন, জ্বালানি খাত ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রকৃতি ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি ও ক্ষতিকর বিনিয়োগ থেকে সরে এসে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের বাৎসরিক ৯৪২ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতীয় পর্যায়ে বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ বন বিভাগ বর্তমানে আইইউসিএন-এর সহায়তায় তৃতীয়বারের মতো ‘জাতীয় ফোনাল রেড লিস্ট’ হালনাগাদ করার কাজ চূড়ান্ত করছে, যেখানে প্রায় ২ হাজার ২০০টি দেশীয় প্রজাতির বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন প্রণীত ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৬’ এর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী পাচার রোধ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি বিপন্ন প্রজাতির জন্য আলাদা ও সুনির্দিষ্ট প্রজাতি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version