বুধবার, অক্টোবর ১৪

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | The Mail BD

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি মোকাবিলার কথা বলে নেওয়া এই পদক্ষেপে প্রদেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিতের ঘটনায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জরুরি অবস্থা জারির পর প্রদেশটির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সড়কে কনটেইনার দিয়ে ব্যারিকেড, শহরজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল এবং পিটিআই নেতাকর্মীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সন্ত্রাসবাদের গুরুতর হুমকি থেকে জনগণকে রক্ষা করতেই সাংবিধানিক এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

জরুরি অবস্থার পরও থামেনি অভিযান

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, রোববার জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর প্রাথমিকভাবে প্রদেশটির বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে দুদিনের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ সচল করা হয়।

অন্যদিকে, পিটিআই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার খাইবার জেলায় দলটির কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পিটিআইয়ের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য, তিনি নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন। এ ঘটনায় সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যুক্তি সরকারের

জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতা তারার অভিযোগ করেছেন, পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকার জঙ্গিদের সঙ্গে যোগসাজশে জড়িত ছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আতা তারারের দাবি, জরুরি অবস্থা জারির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। কেন্দ্রীয় সরকার এর আগে পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করারও চেষ্টা করেছিল বলে তিনি জানান।

তবে পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সে বিষয়ে দলটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিস্তারিত বিবরণ প্রতিবেদনে নেই। ফলে সরকারের অভিযোগ এবং বিরোধী দলের অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে বিতর্ক

পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের পেছনে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি ইমরান খানের সঙ্গে গত এক বছরে তাঁর পরিবারের সদস্য বা আইনজীবীদের সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত ছিল। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করার পর গত আগস্টে তাঁর এক বোন কারাগারে এবং আরেক বোন হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলেন।

এদিকে, ইমরান খানের তিন বোনকে গত সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, সাক্ষাতের সুযোগ ব্যবহার করে ইমরান খান কারাগারের নিয়ম ভেঙে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন।

ইমরানের মুক্তি এবং তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পিটিআইয়ের সমর্থকেরা গত এক সপ্তাহ ধরে খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের লংমার্চ শুরু করেন। এই আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

জরুরি অবস্থা কি বুমেরাং হতে পারে?

পাকিস্তান সরকারের কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্ক করেছেন কয়েকজন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে জমে থাকা ক্ষোভের মুখে সরকারের ওপর চাপ তৈরির পথ বন্ধ করতেই জরুরি অবস্থার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন মনে করেন, পাকিস্তানে ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে, চ্যাথাম হাউজের ফারজানা শেখের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির বিষয়টি।

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিত করা হলে স্থানীয় জনগণের ক্ষোভ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

কুগেলম্যানের মতে, প্রাদেশিক সরকার কার্যকর না থাকলে স্থানীয় জনগণের অভিযোগ ও অসন্তোষ মোকাবিলার দায়িত্বও মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর এসে পড়বে। নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালিত হলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি এবং এর ফলে বাহিনীর ভেতরেও অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষক আরিফা নূরও পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষই এমন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে।

একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পাকিস্তান

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে জঙ্গিদের আস্তানা থাকার অভিযোগ তুলে পাকিস্তান একাধিকবার বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পাকিস্তানের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিরাপত্তার যুক্তিতে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ যদি রাজনৈতিক বিরোধ আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে পাকিস্তানকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাত আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার এটিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিরোধী দলের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ সংকুচিত হলে এর পরিণতি কেন্দ্রীয় সরকারের জন্যও কঠিন হতে পারে।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version