নিজস্ব প্রতিবেদক: জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে মায়ের চোখের সামনেই নদীগর্ভে তলিয়ে গেল আদরের সন্তান। সাঁতরে তীরে উঠে দিশেহারা মা যখন আলো ফেলে খুঁজছেন নাড়িছেঁড়া ধনকে, ততক্ষণে সব শেষ। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারালেন এমদাদুল হক (৩৫) নামের এক যুবক। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার নিথর দেহ উদ্ধার করে।
প্রতিদিনের মতোই একরাশ বেঁচে থাকার তাগিদ নিয়ে বুধবার খুব ভোরে, ফজর আজানের সময় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের চৌতারী গ্রামের ইসমত আলীর ছেলে এমদাদুল। সঙ্গী ছিলেন তার বয়োবৃদ্ধ মা। উজান থেকে ছোট নৌকায় পাথর ও বালু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা। কে জানত, প্রতিদিনের রুটিন যাত্রাই হবে জীবনের শেষ যাত্রা! পথিমধ্যে বিরিশিরি ঘাটের পুরোনো ব্রিজের কাছে পৌঁছাতেই বাঁশের খুঁটির (কোডা) সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে তাদের ছোট নৌকাটির। মুহূর্তেই নদীর বুকে উল্টে যায় মা-ছেলের বেঁচে থাকার সম্বল।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই গল্প বড়ই হৃদয়বিদারক। নৌকাডুবির পর প্রাণ বাঁচাতে মা ও ছেলে দুজনেই নদীতে ভাসতে থাকেন। অথৈ জলের মাঝে আতঙ্কিত মা যখন ছেলেকে ডাক দেন, তখন অন্ধকার চিরে ভেসে আসে এমদাদুলের কণ্ঠস্বর- “মা, আমি বাঁশের সঙ্গে ধরে দাঁড়িয়ে আছি”। সন্তানের অভয়বাণীতে সামান্য ভরসা পেয়ে বৃদ্ধা মা জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সাঁতরে নদীর তীরে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
তীরে উঠে লাইটের আলো নদীর বুকে ফেলতেই তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। যেখানে ছেলেকে বাঁশ ধরে থাকতে দেখেছিলেন, সেখানে কেউ নেই। নদীর অতল গভীরে ততক্ষণে চিরতরে হারিয়ে গেছেন এমদাদুল। অন্ধকার নদীর তীরে দাঁড়িয়ে অসহায় মায়ের গগনবিদারী আর্তনাদে ছুটে আসেন স্থানীয়রা।
সকালে এমন হৃদয়বিদারক খবর ছড়িয়ে পড়লে নদীর তীরে ঢল নামে শত শত মানুষের। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে খবর পৌঁছালে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি দল পাঠানো হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তিনি নিজেও ছুটে যান। পাশাপাশি উদ্ধারকাজের জন্য দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে খবর দেওয়া হয়।
অবশেষে উৎকণ্ঠার প্রহর শেষ হয় বিষাদে। বেলা ১১টার দিকে ডুবুরি দল এমদাদুলের মৃতদেহ নদী থেকে উদ্ধার করে। নদীর তীরে তখন শুধুই সন্তানের জন্য এক মায়ের বুকফাটা আহাজারি, যা উপস্থিত সবার চোখেই জল এনে দেয়। সাধারণ এক শ্রমজীবী পরিবারের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিণতিতে পুরো দুর্গাপুর উপজেলাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের এক গাঢ় ছায়া। নদীর ঢেউয়ে মিলিয়ে যাওয়া ‘মা, আমি বাঁশ ধরে আছি’ কথাটিই যেন এখন বিরিশিরি ঘাটের বাতাসে বিষাদের সুর হয়ে বাজছে।




