রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)
একজন মানুষ তখন আর জীবিত নেই। অথচ প্রযুক্তির কারসাজিতে তাঁকে ‘জীবিত’ দেখিয়ে ভিডিও পাঠানো হয়েছিল পরিবারের কাছে। সেই ভিডিও দেখিয়ে দাবি করা হয় মুক্তিপণ। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারও দেয় চার লাখ টাকা। কিন্তু টাকা দিয়েও রাকিব ইসলামকে আর ফেরত পায়নি পরিবার।
শেষ পর্যন্ত সেই রাকিবের লাশ মিলেছে নীলফামারীর ডিমলায়—একটি বাড়ির দক্ষিণ পাশে মাটির নিচে।
ঢাকার কাফরুল এলাকায় ১৭ বছর বয়সী রাকিব ইসলামকে হত্যার পর তাঁর লাশ কার্টনে ভরে ডিমলায় নিয়ে এসে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ মামুন (২৬) নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। হত্যার ঘটনা গোপন রাখতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামুনকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ডিমলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায় মাটির নিচ থেকে রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়।
রাকিব টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হামনগর ইউনিয়নের উদ্যমপুর গ্রামের খাদেমুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলে। আর মামুন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকার আফসার আলীর ছেলে।
রাকিবের ভাই জহুরুল ইসলাম জীবনের ভাষ্য, রাকিবকে জীবিত অবস্থায় ফেরত দেওয়ার কথা বলে পরিবারের কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করেন মামুন। ভাইকে বাঁচানোর আশায় পরিবার চার লাখ টাকা দেয়। কিন্তু অর্থ দেওয়ার পরও রাকিবকে ফেরত দেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় পরিবারের সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। পরে ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পুলিশ তদন্তে নামার পর সামনে আসতে থাকে ঘটনার একের পর এক তথ্য।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় অভিযান চালিয়ে মামুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রাকিবের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে আসে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এরপর রাকিবের পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা করা হয়। মামলাটির ডিএমপি মামলা নম্বর–০৫; তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মামুন যে তথ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে, তাতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার একটি কক্ষে রাকিবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়। একপর্যায়ে রাকিবকে হত্যা করা হয় বলে তাঁর স্বীকারোক্তির কথা জানিয়েছে পুলিশ।
হত্যার পর মরদেহটি একটি কার্টনের মধ্যে রাখা হয়। এরপর সেটি নিয়ে বাসা থেকে বের হন মামুন। ঢাকার কল্যাণপুরে গিয়ে রংপুরগামী একটি গাড়িতে ওঠেন তিনি।
পথে কার্টনের ভেতরে কী রয়েছে জানতে চাইলে সেটিতে ইলিশ মাছ আছে বলে জানান মামুন—এমন তথ্যই জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রংপুরে পৌঁছানোর পর লোকাল বাসে করে ডিমলায় আসেন তিনি। এরপর কার্টনে থাকা মরদেহ নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে বাড়ির দক্ষিণ পাশে কার্টনসহ লাশটি মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্যে দাবি করেছেন মামুন।
মামুনকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করতে তাঁকে ডিমলার বালাপাড়া এলাকায় নিয়ে আসে পুলিশ। তাঁর দেখানো জায়গায় বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশে মাটিচাপা দেওয়ার স্থান শনাক্ত করা হয়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আদালতের নির্দেশে দুপুর ১টার দিকে সেখানে মাটি খুঁড়ে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি ডিমলা থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি ভিডিওর অভিযোগ।
পরিবারের অভিযোগ, রাকিবকে হত্যার রয়েছেন—এমন বিশ্বাস তৈরি করা হয়েছিল।
এরপর ওই ভিডিওকে কেন্দ্র করেই মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। সন্তানকে জীবিত উদ্ধারের আশায় পরিবার চার লাখ টাকা পরিশোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সেই আশার কোনো বাস্তবতা মেলেনি।
বরং কয়েক দিন পর জানা গেল, রাকিব জীবিত নন; তাঁর মরদেহ পড়ে আছে ডিমলার মাটির নিচে।
জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রতন (২৬) ও নুর জামাল (২৫) নামের আরও দুজনের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তাঁরা সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন কি না—এসব এখনো নিশ্চিত নয়।
পুলিশ বলছে, বিষয়টি তদন্তাধীন। তাঁদের সংশ্লিষ্টতা ও ঘটনার প্রকৃত ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
রাকিবকে কেন হত্যা করা হলো, হত্যার পর এআই প্রযুক্তিতে ভিডিও কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল, ভিডিওটি কারা তৈরি বা সরবরাহ করেছিল, চার লাখ টাকার পুরো অর্থ কোথায় গেছে এবং রতন ও নুর জামালসহ আর কেউ এ ঘটনায় জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা হয়েছে। আসামিকে গ্রেপ্তার করে ডিমলায় এনে লাশ উদ্ধারে সহযোগিতা চাওয়া হয়। ডিমলা থানা পুলিশ লাশ উদ্ধারে সহযোগিতা করেছে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নীলফামারী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কারণ, মুক্তিপণের অর্থ লেনদেন, এআই প্রযুক্তিতে ভিডিও তৈরির ঘটনা এবং অন্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।




