কেন্দুয়া প্রতিনিধি: দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া এক বীর সন্তানের পরিবার আজ নিজেরাই চরম নিরাপত্তাহীনতায়। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফরপুর (পশ্চিমপাড়া) গ্রামে জুলাই আন্দোলনে শহীদ আলী হোসেনের ছোট বোনকে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণচেষ্টা, মারধর ও লুটপাটের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত মামলা দায়েরের নয় দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্টো আসামিপক্ষের ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকিতে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে ভুক্তভোগী পরিবারটির।
প্রাপ্ত অভিযোগ ও সংযুক্ত এজাহারের তথ্যমতে, জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ববিরোধ ও টাকা পয়সার লেনদেন নিয়ে এক অমানবিক ঘটনার সূত্রপাত। এজাহারে বাদী রিমি আক্তার ওরফে মিমি আক্তার (২৯) উল্লেখ করেছেন, প্রতিবেশী রমজান মিয়া (৫০) তাকে বিভিন্ন সময়ে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। এতে রাজি না হওয়ায় এবং জমির দলিল সংক্রান্ত সালিশের জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর (সোমবার) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাদীর নিজ বাড়ির উঠানে আসামিরা অতর্কিত হামলা চালায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রমজান মিয়ার নেতৃত্বে ফজল হক (৪২) ও সুমন মিয়া (২২) লোহার রড দিয়ে বাদীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা করে। তাকে বেধড়ক মারধরের পর শ্লীলতাহানি ঘটিয়ে পরিধেয় কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং গলা থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ আনা ওজনের সোনার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার ভয়াবহতা কেবল মারধরের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, একপর্যায়ে রমজান মিয়া ভুক্তভোগীকে জোরপূর্বক নিজের বসতঘরে টেনে নিয়ে যায়। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এসময় ভুক্তভোগী জীবনের মায়া ত্যাগ করে আর্তচিৎকার শুরু করলে তার পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সাক্ষীরা এগিয়ে আসেন এবং দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, যার কারণে মামলা দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেন্দুয়া থানায় বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিভিন্ন ধারায়মামলাটি রুজু করা হয়। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর মামলাটি আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। মামলায় অনধিকার প্রবেশ, হত্যাচেষ্টা, শ্লীলতাহানি, চুরি ও অবৈধ আটকের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ঘটনায় শহীদ আলী হোসেনের ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা বেদেনা আক্তারের আর্তনাদ এলাকার বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। অসহায়ত্ব প্রকাশ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার মানুষ নেই, আমি অসহায় ও দুর্বল। আমার ছেলে আলী হোসেন আজ বেঁচে থাকলে আমার সামনে আমার মেয়েকে এভাবে কেউ নির্যাতন করতে পারত না। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু ও সঠিক বিচার চাই।”
এদিকে মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিপক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে বাদী ও সাক্ষীদের মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদী আক্ষেপ করে বলেন, শহীদ পরিবারের সন্তান হয়েও তারা আজ নিজ ভূমে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তবে অভিযুক্ত রমজান মিয়া, ফজল হক ও সুমন মিয়ার পরিবারের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা।
সার্বিক বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং পেমই তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) বাবুল আক্তার জানিয়েছেন, মামলা হয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আনীত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
বৈষম্যহীন ও নিরাপদ সমাজের স্বপ্নে যে পরিবারের সন্তান প্রাণ দিয়েছে, সেই পরিবারের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।




