শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাহিত্য আর সংগঠনের সম্পর্ক কি সাংঘর্ষিক নাকি পরিপূরক? নিভৃতচারী লেখকের জন্য কি আদৌ সংগঠনের প্রয়োজন আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এল সাহিত্যের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের নানা দিক। উঠে এল আক্ষেপ, সংশয় এবং উত্তরণের পথও।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের আঙিনায় অনুষ্ঠিত ‘বীক্ষণ’ সাপ্তাহিক পাঠচক্রের ২২১৯তম আসরে এমনই এক প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জন্ম হলো। ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যান এলাকায় অবস্থিত ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের এই আঙিনা মূলত একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক আড্ডা বা মুক্ত প্রাঙ্গণ।

এবারের আসরের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘সাহিত্যের সংগঠন, সংগঠনের সাহিত্য’। বিষয়টি শুনতে যতটা সরল, আলোচনার গভীরে এর মাত্রা ও তাৎপর্য ঠিক ততটাই গভীর ও বিস্তৃত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন উপস্থিত গুণীজনেরা। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক কবি মোস্তফা তারেকের সভাপতিত্বে এবং কবি মুহাম্মদ মুস্তাকিম বিল্লাহর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় আসরটি পরিণত হয় বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের লেখকদের মেলবন্ধনে।

প্রধান আলোচকদের একজন, বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি কবি ইসলাম রফিক তার বক্তব্যে সাহিত্য ও সংগঠনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সাহিত্য এবং সংগঠনের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, বরং রয়েছে এক নিবিড় সহযাত্রা। সাহিত্য সমাজের আত্মার ভাষা হলে, সংগঠন সেই ভাষাকে দেয় কাঠামো ও সুউচ্চ স্বর। একজন লেখকের কলম যতই শাণিত হোক না কেন, তার প্রতিধ্বনি ছড়াতে সম্মিলিত প্রয়াসের বিকল্প নেই। সংগঠন মূলত সেই মঞ্চ, যেখানে ব্যক্তিক প্রতিভা সামষ্টিক জাগরণের রূপ পায়।”

নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সহ-সভাপতি কবি এনামূল হক পলাশ আলোচনার ক্যানভাসকে নিয়ে যান ইতিহাসের গভীরে। তিনি দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখান, সাহিত্যের সূচনালগ্ন থেকেই সংগঠনের অপরিহার্য উপস্থিতি ছিল, যা যুগে যুগে সৃজনশীলতার মশাল বহন করেছে। তবে অতীত গৌরবের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের নিঃশব্দ উদ্বেগের কথাও তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আজকের বাস্তবতায় মহৎ ঐতিহ্য ধীরে ধীরে কিছু ‘সাংস্কৃতিক মাফিয়া চক্র’ বা ‘কালচারাল টাউট’-এর কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রকৃত সৃজনশীল মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন প্রান্তিকে।” তার এমন সংশয় নিছক অভিযোগ নয়, বরং তা ছিল গোটা সাহিত্য সমাজের প্রতি আন্তরিক আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান।

মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি সুরঞ্জিত বাড়ই উন্মোচন করেন সাহিত্যের সমাজবাস্তবতার আরেক নির্মম চিত্র। তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট তথাকথিত ‘এলিট সাহিত্যিক’ এবং নিভৃতে অবিরাম কলম চালিয়ে যাওয়া সাধারণ ও প্রকৃত সাহিত্যিকদের মধ্যকার আকাশপাতাল ব্যবধানের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “প্রকৃত স্রষ্টার দারিদ্র্য ও বঞ্চনা আজ আমাদের সাহিত্যের জন্য এক নীরব প্রতিবাদ। সাহিত্যের মূল্যায়ন কেবল পদ-পদবি বা পৃষ্ঠপোষকতার নিরিখে নয়, বরং সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির মানদণ্ডেই হওয়া উচিত।”

বহুমাত্রিক এই আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাখাওয়াত বকুল, কবি সরকার আজিজ, কবি এহসান হাবীব প্রমুখ। তাদের সুচিন্তিত মতামতে আসরটি হয়ে ওঠে আরও চিন্তাউদ্দীপক ও পরিপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে সভাপতির বক্তব্যে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক কবি মোস্তফা তারেক আমন্ত্রিত অতিথি, আলোচক এবং উপস্থিত সকল কবি-সাহিত্যিকের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানান। এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে সাহিত্যের সংগঠন ও তার দায়বদ্ধতা নিয়ে আয়োজিত তাৎপর্যপূর্ণ এই আসরের।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version