–মো. তানভীর হায়াত খান
নেত্রকোণা জেলা শহরের মেছুয়া বাজারের বেণীমাধব প্লাজার ছোট্ট একটি খোপ। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে সেখানে এক আদিম, মরমী নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। খোপটি ভীষণ সাধারণ এবং জীর্ণতার চাদরে মোড়ানো, যার আসবাব বলতে কেবল দুটো ক্ষয়িষ্ণু চেয়ার, দুটো টেবিল আর একপাশে পেতে রাখা একটি কাঠের বেঞ্চ। মাথার ওপরে এক চিলতে টিনের চাল; বর্ষার দিনে যখন মেঘের ডম্বরু বাজে, তখন টিনের চালের টুই চুইয়ে, জংধরা পুরোনো দেয়াল বেয়ে অবাধ্য উস্সিলার পানি পড়ে। ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ধূলিধূসরিত ছাইদানির পাশে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে শুয়ে আছে বাংলা সিনেমার চৌধুরী সাহেবদের আভিজাত্যের প্রতীক- ধূমপান করার সেই চিরচেনা হুঁকো-পাইপ।
এই মরমী পরিমণ্ডলে বসে একজন মানুষ আপন মনে চিবিয়ে যাচ্ছেন আতপ চাল, কখনো লবঙ্গ, আবার কখনো কাঁচা চিঁড়া। একটু আগে কেউ একজন এক কাপ ধোঁয়া ওঠা রং চা দিয়ে গেছে; সেই ধোঁয়া অলস ভঙ্গিতে বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে চা-টি কখন যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে, সেদিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই। পরনে দাপ্তরিক পোশাক, কিন্তু সাধারণ প্যান্টটি হাঁটুর নিচ থেকে নির্মমভাবে ছেঁড়া। একটু আগেই অফিস থেকে মোটরসাইকেলযোগে ফেরার পথে আচমকা সামনে চলে আসা এক অবুঝ প্রাণীর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন দুর্ঘটনার মুখে। হাঁটুর নিচে দু-এক জায়গায় চামড়া থেঁতলে গিয়ে চুইয়ে পড়ছে রক্ত; অথচ সেই শারীরিক বেদনার বিন্দুমাত্র খেয়াল তাঁর নেই। কাউকেই এই দুর্ঘটনার কথা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি তিনি; অথচ ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়েই সোজা চলে এসেছেন তাঁর সৃষ্টির এই নিজস্ব ‘দরবারে’।
এনামূল হক পলাশ আসলে এক অদ্ভুত এবং খেয়ালী অবধূত, যাঁর ভেতরের এবং বাইরের রূপ প্রতিনিয়ত কোনো এক মহাজাগতিক রূপান্তরকে স্পর্শ করে। কখনো তিনি বুঁদ হয়ে থাকেন সুফীবাদের অতলান্ত গভীর চিন্তা ও ধ্যানে, আর তখন তাঁর বাহ্যিক অবয়বেও নেমে আসে এক সুফিয়ানা মরমী আবহ। সমকালের এই মরমী সাধকের মাথার টুপিগুলোর মধ্যেও রয়েছে এক বৈচিত্র্যময় আখ্যান। কখনো তাঁর মাথায় শোভা পায় প্রাচীন মিশরীয় পাশাদের রাজকীয় ঝালরযুক্ত কালো ফেজ টুপি, কখনো হিমালয়ের কোল থেকে আসা জ্যামিতিক নকশার ঐতিহ্যবাহী রঙিন নেপালী টুপি, আবার কখনো তিনি মাথা জড়িয়ে নেন এক মরমী দরবেশের আত্মিক আভিজাত্য মাখানো পাগড়িতে। তাঁর শান্ত চোখের চশমা আর সাদা-কালো দাড়ি-গোঁফের নিখাদ অবয়বে সবসময় লেগে থাকে এক মৃদু, নির্মোহ ও ধ্যানী স্মিত হাসি।
এই রূপান্তরের খেলা শুধু মাথাতেই থেমে থাকে না; তাঁর গলায় ও কাঁধে জড়িয়ে থাকে সাদা-কালো চেক কিংবা খয়েরি ও লালচে ঘরানার নানা রঙ ও বুননের বৈচিত্র্যময় উত্তরীয় কিংবা শাল। এই সবকিছুই যেন তাঁর বহুমাত্রিক মনন, বিশ্বসাহিত্যের প্রতি টান এবং ছন্নছাড়া সাধক সত্তারই এক একটি বিমূর্ত চাক্ষুষ প্রকাশ।
তাঁর এই দরবার অর্থাৎ ছোট্ট খোপটায় রয়েছে আতরের এক স্নিগ্ধ আয়োজন; সাঁঝবেলা নামলেই সেখান থেকে চারদিকে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একনিষ্ঠ এক ভক্ত এসে গভীর মায়ায় ধূপের ধোঁয়া দিয়ে যায় পুরো খোপটায়, যা জীর্ণ টিনের চালের নিচের এই অবধূতের ঘরটিকে মুহূর্তেই এক অপার্থিব ও আধ্যাত্মিক আশ্রমে রূপান্তর করে। সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন গভীর রাত নামে, তখন এই ধূপ-আতরের সুবাস আর উস্সিলার জলপতনের শব্দকে সঙ্গী করে আগমন ঘটে অসংখ্য চাতক সাধক, অনুরাগী আর ভক্তদের। এখানে রাজকীয় কোনো আয়োজন নেই; আপ্যায়নের ডালা সাজানো থাকে কেবল চা, চিঁড়া, আতপ চাল আর লবঙ্গের সহজ স্বাদে। আর সেই দরবারি আড্ডার আকাশে ডানা মেলে দেশ-বিদেশের অন্তহীন গল্প, গূঢ় দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব আর মহাজাগতিক গভীর সব চিন্তা। এই খোপের মানুষটিই- মগড়া নদীর তীরের এক নির্মোহ সাধক, কবি এনামূল হক পলাশ।
মহৎ সাহিত্যের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো তা যুগপৎভাবে মাটির কাছাকাছি থাকে এবং নক্ষত্রের দিকে ডানা মেলে। সমকালীন বাংলা কবিতার অবক্ষয়ী ও জটিল তাত্ত্বিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যিনি শব্দকে করে তুলেছেন মাটির সমার্থক, তিনি কবি এনামূল হক পলাশ। একজন ভাবুক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক এবং গীতিকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ কেবল সাহিত্যের পরিধিকেই বিস্তৃত করেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে একটি জনপদের মরমী ও দ্রোহী চেতনার প্রামাণ্য দলিল। জীবনের জটিল আবর্তে দাঁড়িয়েও যিনি প্রতিনিয়ত ‘সহজের সাধনা’ করে চলেছেন, তাঁর সৃষ্টিশীলতা পাঠ করা মানেই এক জীবন্ত কালখণ্ড, বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃতি এবং নিজস্ব শিকড়ের গভীর মানবিক বোধের মুখোমুখি হওয়া।
১৯৭৭ সালের ২৬ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদে চিরাম গ্রামের মাতুলালয়ে যে জীবনের সূচনা, তা বিকশিত হয়েছে মগড়া ও কংসের পলিবিধৌত মাটির সুবাস বুকে নিয়ে। শৈশব কেটেছে গোপালপুর বাজারে, আর মনন গঠিত হয়েছে বারহাট্টা পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ের পাতার হলদেটে ঘ্রাণে।
১৯৯৫ সালে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘মাটির সুবাস’ পত্রিকায় কবির প্রথম কবিতার জন্য পাওয়া ‘চল্লিশ টাকা’র মানি অর্ডারটি কেবল একটি আর্থিক প্রাপ্তি ছিল না, তা ছিল এক আজন্ম শব্দশ্রমিকের প্রথম স্বীকৃতি। সেই থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ রেলওয়ে কলোনীর দিনগুলোতে সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এর বিশেষ সংখ্যায় নিয়মিত লেখালেখি তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে আরও শাণিত করে তোলে।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রকৃতির গূঢ় রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি তিনি পাঠ করেছেন সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকেও। নেত্রকোণা সরকারী কলেজ এবং পরবর্তীতে গুরুদয়াল সরকারী কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের এই যাত্রা তাঁর মননে বিজ্ঞান ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে। কবির জীবন কেবল নিভৃত কোণে বসে শব্দ বোনার ইতিহাস নয়, তা রাজপথের উত্তাল স্লোগানের সাথেও সম্পৃক্ত।
১৯৯৮ সালে এক প্রথিতযশা প্রগতিশীল বিপ্লবী বাম সংগঠনের হাত ধরে রাজনীতির আঙিনায় তাঁর প্রবেশ। এই রাজনৈতিক দীক্ষা তাঁর কবিতার ভেতর বুনে দেয় শোষিত মানুষের জন্য গভীর পক্ষপাত। পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করলেও, তাঁর ভেতরের বিপ্লবী সত্তা কখনো ম্লান হয়নি। জমি, দলিল আর লাল ফিতার কর্মব্যস্ততার মাঝেই তিনি অভ্যাস বা সাধনা জারি রেখেছেন।
নেত্রকোণা সদর উপজেলার মালনী এলাকায় কবি নির্মলেন্দু গুণের সাথে বিশ্ব কবিতার আবাস্থল খ্যাত ‘কবিতাকুঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে যুক্ত থেকে এর প্রথম পরিচালকের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে নিজস্ব ভাবনায় ‘অন্তরাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা—তাঁর গভীর সংস্কৃতিমনস্কতার অনন্য নিদর্শন। ২০০৯ সালে প্রকাশিত কবির প্রথম গ্রন্থ ‘অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ‘সুফি কবিতা’, ‘সংবিধানের পোস্টমর্টেম’ কিংবা ‘পলায়নের আগে’- প্রতিটি গ্রন্থই যেন এক একটি স্বতন্ত্র মনস্তাত্ত্বিক স্টেশন।
প্রগতিবাদী প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকারের ভাষায়, এনামূল হক পলাশ তাঁর ব্যক্তিগত বোধ থেকে শুরু করে সামাজিক সংকট পর্যন্ত সবকিছুর মর্মানুধাবনে অনন্যতার প্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন, যেখানে তাঁর প্রতিটি কবিতাই হয়ে উঠেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের জীবন্ত উদাহরণ। কবি নির্মলেন্দু গুণও তাঁর মননকে চিহ্নিত করেছেন সকল প্রাণের অভয়ারণ্য হিসেবে।
এনামূল হক পলাশের সৃষ্টিশীলতার এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর মাহমুদ দারবিশ, তুরস্কের নাজিম হিকমত কিংবা আধুনিক সাহিত্যের জাদুকর পাওলো কোহেলহো-র অনুবাদ করে তিনি বাংলা ভাষার পাঠকদের বিশ্বসাহিত্যের মূলধারার সাথে যুক্ত করেছেন। একই সাথে বাংলার লোকায়ত ‘মালজোড়া’ গানের স্রষ্টা বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের ভাস্কর্য নির্মাণ এবং ‘ভূমি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার ধারণাপত্র তৈরির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন- তিনি শুধু মগড়া নদীর বাঁকের লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করেন না, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেও জানেন।
কবি যখন সমকালের অন্যায় দেখে চুপ থাকেন, তখন সাহিত্য তার নৈতিক ভিত্তি হারায়। কিন্তু এনামূল হক পলাশ ছিলেন আপসহীন। ২০০৯ সাল থেকে আদেশ বা দলদাসত্বের বাইরে এসেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কলম ছিল সোচ্চার। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির এক মানসিক ও আর্থিক সংগঠক। স্বৈরাচারী সরকারের চোখরাঙানি, বিভাগীয় মামলা এবং দুর্গম হাওরে শাস্তিমূলক বদলির শিকার হয়েও তিনি বুক চিতিয়ে লড়েছেন। আবু সাঈদের নির্মম শাহাদাতের পর তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে আসে এক অনবদ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা স্বৈরাচারের পকেটস্থ মানচিত্রের বিরুদ্ধে বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক যুবকের বীরত্বকে অমর করে রাখে। এই দ্রোহেরই কাব্যিক সংকলন তাঁর ১১তম গ্রন্থ ‘পলায়নের আগে’, যা স্বৈরাচারের পতনের আগের উত্তাল প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে কবি নিজ বাসভবনের ছাদে গড়ে তুলেছেন এক দৃষ্টিনন্দন ছাদবাগান, যার ছোট ছোট চৌবাচ্চায় ফুটে থাকা শাপলা আর পদ্ম দেখে কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর বাসস্থানের নাম দিয়েছেন ‘স্থলপদ্ম’। পাখির কিচিরমিচির আর সবুজের সমারোহে ঘেরা সেই নিভৃত কোণে বসেই কবি খুঁজে নেন জীবনের মূল সুর।
অধ্যাপক বিধান মিত্রের ভাষায়, তিনি তাঁর ভাবনাপূঞ্জকে পাঠক-বোধাতীত জগতে নিয়ে যাননি, কবিতার ভাব-লয়-দেহকে তিনি বরাবরই মাটি ও মানুষ সংলগ্ন রেখেছেন। জীবনের বিচিত্রতা কবিকে দিন দিন সহজ হওয়ার সাধনার দিকে নিয়ে গেছে। তিনি সাধু হতে চান না, বরং সহজ হয়ে অন্তরাশ্রমের পথ বেয়ে পৃথিবীর বুকে ভালোবাসার ফুল ছড়িয়ে দিতে চান।
আরব ভূখণ্ডের তপ্ত মরুভূমির প্রতিরোধ-গাথা থেকে শুরু করে মেছুয়া বাজারের বেণীমাধব প্লাজার সেই জীর্ণ খোপ কিংবা মগড়া নদীর ধীরস্থির বাঁক পর্যন্ত এনামূল হক পলাশের যে সাহিত্যিক পরিভ্রমণ, তা আসলে মানবাত্মারই এক নিরন্তর অন্বেষণ। যথার্থ কবিতা কালান্তরের পথে নতুন নতুন অর্থ ধারণ করে মূর্ত হয়। তিনি মাটির কাছাকাছি থেকে, আঞ্চলিক সংস্কৃতির বৈভবকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়ে, মানুষের মুক্তির গান গেয়ে চলেছেন। একজন সৃজনশীল কর্মবীর, আপাদমস্তক কবি এবং সহজের সাধক হিসেবে এনামূল হক পলাশ সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ও অপরিহার্য নাম, যার সৃষ্টি আলোড়িত করবে আগামী বহু প্রজন্মকে।



