বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭

ব্রিটিশ আমল ও ভাষাগত বিভাজনের শুরু:
এই ভূখণ্ড যখন ব্রিটিশরা শাসন করতে এলো, তারা অনেক দূরের এক ভাষা নিয়ে এসে সেই ভাষাকে চাপিয়ে দিয়েছে মানুষের ওপর। ফার্সি ভাষার জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ইংরেজি ভাষা।

ব্রিটিশ শাসকরা বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত আরবি-ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের সাহায্যে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের বহুল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একটি বাংলা ভাষা প্রবর্তনের চেষ্টা চালান। ফলে একটি বিভাজিত চেতনার উদ্ভব হয়। বিষয়টি হিন্দু সাহিত্যিকদের হিন্দি প্রীতি ও মুসলিম সাহিত্যিকদের উর্দুপ্রীতির দিকে ঠেলে দেয়।

মুসলিম সাহিত্যিকরা তখন উর্দু ভাষার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তারা ভাবতে থাকেন উর্দু তাদের নিজস্ব ভাষা। ফলে হিন্দি ভাষার প্রভাব পড়ে বাংলা ভাষায়। অপরদিকে ইংরেজি রাজভাষা হওয়ায় বাংলা ভাষা অবহেলিত থেকে যায়। কিন্তু, জনগণের মধ্যে বাংলা ভাষা নিজগুণে বিকশিত হতে থাকে। বটতলার পুঁথি সাহিত্য বা অন্যান্য লোকসাহিত্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষা জনগণের মধ্যে নিজেকে জীবিত রাখে। অনেক সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী সাধারণ জনগণকে শিল্প সাহিত্যের উপাদান হিসেবে নিয়ে জনগণের সংস্কৃতি ও ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

জিন্নাহ, গান্ধী ও চরমপন্থী রাষ্ট্রের বীজ:
এর মধ্যে বিলাত থেকে ধরে এনে নেতা বানানো হলো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে। এই বিলাতি সংস্করণ সেক্যুলার মানুষটি হয়ে গেলেন মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা। জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন-আচার পদ্ধতি নিয়ে কথা আর নাই-বা বললাম।

তার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা হলো মহাত্মা গান্ধীকে। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এই মানুষটাকে সামনে রেখে অগোচরে অগ্রসর হতে থাকলো একটি হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা। উভয় ধারণা থেকে দুটি চরম ধর্মীয় জাতিবাদী রাষ্ট্রের বীজ অঙ্কুরিত হলো।

ব্রিটিশ সরকার চলে যাওয়ার পর ভারতীয় অংশে অভিজাত হিন্দু লেখকদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে হিন্দি হয়ে যায় সেই রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের ভাষা। সেখানে বাংলা ভাষা থেকে যায় উপেক্ষিত। গান্ধী হয়ে গেলেন ভারতীয় জাতির পিতা। অপরদিকে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জাতির পিতা হয়ে গেলেন জিন্নাহ।

বিপত্তি ঘটে পাকিস্তান অংশে। সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে পূর্ব বাংলার মানুষ তার প্রতিবাদ জানায়। লড়াই সংগ্রাম চলতে থাকে। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর পরই দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য সামনে আসে। সেই সাথে এটাও সামনে আসে যে, শাসক পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। ফলে আওয়াজ ওঠে, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’।

ভাষা আন্দোলন ও জিন্নাহর পতন:
একইসাথে শুরু হয় ভাষা নিয়ে এক রাজনীতি। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা নাকি উর্দু?’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার দাবি করে। ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। তমদ্দুন মজলিশের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরুল হক ভুঁইয়া এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালি গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য একটি বিল আনেন। মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বাঙালি পার্লামেন্ট সদস্যদের একাংশ এর পক্ষে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ সমর্থিত এমপিরা এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সৃষ্টি হয় পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। তারা পরবর্তীতে সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। মার্চ মাসের প্রথমে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি গঠিত হয়।

২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ “স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং” শিরোনামে একটি ভাষণে বলেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্দু, একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয়কে তুলে ধরে।”

জিন্নাহর এই বাংলা বিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। জাতির জনক থেকে মানুষের চোখে বিচ্যুত হন জিন্নাহ। কিন্তু, মজার বিষয় হচ্ছে, জিন্নাহ ভালো উর্দু জানতেন না। উর্দু তার মাতৃভাষাও ছিলো না।

পাকিস্তান রাষ্ট্র ঘোষণা করার সময় জিন্নাহ বেতারে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বক্তৃতাটি ছিল ইংরেজিতে। কিন্তু তিনি বক্তৃতা শেষ করেন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বাক্য দিয়ে। ইংরেজির রেশে সেই বাক্যটি শোনা গিয়েছিল এমন যে, “পাকিস্তান ইন দ্যা ব্যাগ”। এই কথাটি নিয়ে অনেক হাস্যরস প্রচলিত আছে।

জিন্নাহর উত্তরাধিকার ও বর্তমান রাজনীতি:
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর আগমন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি-দাওয়া ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার একটি দাবিনামা প্রস্তুত করা হয়। দাবিনামাটি তৈরি করেন আব্দুর রহমান চৌধুরী (পরবর্তীতে বিচারপতি)। এটি পাঠ করার দায়িত্বটি ডাকসুর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের ওপর ন্যস্ত হয়। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন অরবিন্দ বোস। তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির নেতারা দাবিনামাটি পাঠের দায়িত্ব দেন তৎকালীন জিএস গোলাম আজমকে। দাবিনামা প্রস্তুতির সাথে জড়িত ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুবসহ স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির নেতৃবৃন্দ। গোলাম আজম সমাবেশে দাবিনামাটি পাঠ করেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত দাবিটি এড়িয়ে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত কয়েকটি দাবি মেনে নেন। পরবর্তী আলাপ অনেক লম্বা।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে জিন্নাহ চ্যাপ্টার এখানেই ক্লোজ হয়ে যায়। এখানে জিন্নাহ ছিলেন ইতিহাসের একটি চরিত্র। তিনি আমাদের কেউ নন। আবার তাকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। এই সেক্যুলার মানুষটি সুন্নি মুসলিম ছিলেন না। অথচ সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জিন্নাহ এখন প্রাসঙ্গিক কি না, সেটা ইসলাম ধর্মীয় জাতিবাদী চিন্তার নেতারা ভালো বলতে পারবেন।

এখানেই ধর্মীয় জাতিবাদের মুখোশ খুলে যায়। এরা রুমিকে নিয়ে গর্ব করে, অথচ রুমির অনুসারীদের কাফের ফতোয়া দেয়। এরা জিন্নাহকে সামনে আনে। অথচ জিন্নাহর উপাধি ছিল এদের কাছে “কাফের-ই-আজম”। আর পাকিস্তান ছিল যাদের জন্য কাফের-ই-স্থান, তারাই কি এখন জিন্নাহ বন্দনায় নেমেছেন?

আমার মতে, জিন্নাহর ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগের রাজনৈতিক রূপের উত্তরাধিকার বহন করে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগ। এর ব্যাখ্যা অন্য একদিন দেব। জিন্নাহর রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করে আওয়ামী লীগ নামের দলটি। কারণ জিন্নাহর মৃত্যুর পর মুসলিম লীগ তার সেক্যুলার চরিত্র হারিয়ে উগ্রবাদে ধাবিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ গঠন করা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। সে হিসেবে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জিন্নাহর রাজনৈতিক হিসাব মিলবে না। জিন্নাহর পুনর্জাগরণ মানে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সংগ্রামী আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণ।

বহুদিন পর কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা করতে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। যারা জিন্নাহকে গালাগালি করছেন, তারাই বা তা কেন করছেন তাও বুঝে আসে না। জিন্নাহ তার বক্তব্যে কখনো ধর্মীয় জাতিবাদী ধারায় দেশকে অগ্রসর হতে বলেন নি, যদিও মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। তার একটি খণ্ডিত বক্তব্য মানুষের মাঝে ছড়িয়ে আছে— “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। এই একটা বক্তব্যের জন্য তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভিলেন হয়ে আছেন।

বলা হয়, জিন্নাহর ভাষণের সময় উপস্থিত লোকজন সেখানে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান। তাতে প্রতীয়মান হয়, জিন্নাহর আমলে চিৎকার করে প্রতিবাদ করা সম্ভব হতো। আমরা নিজস্ব রাষ্ট্র পাওয়ার পর এই স্বাধীন রাষ্ট্রে সময়ে সময়ে চিৎকার করার অধিকার হারিয়ে ফেলি। এটাকে আপনারা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আমার প্রশ্ন, বন্ধ দরজা খুলে দিলো কারা? তাদের উদ্দেশ্য কি?

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version