নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রতিদিনের মতোই হাঁসের ঝাঁক নিয়ে হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বেরিয়েছিলেন শফিকুল। জীবিকার তাগিদে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যে হাওর ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী, সেই হাওরের বুকেই প্রকৃতির নির্মম আঘাতেই নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার পাউকাটা হাওরে বজ্রপাতে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
নিহত শফিকুল মিয়া (৩০) উপজেলার সাতগাঁও গ্রামের ইসহাক মেম্বারের ছেলে। তার অকাল মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই ঝরে যায়নি, চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে একটি পরিবার।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে শফিকুল তার পালিত হাঁসগুলো নিয়ে উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের পাউকাটা হাওরে যান। বর্ষার মেঘলা আবহাওয়ায় তখনো আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। হঠাৎ করেই শুরু হয় বজ্রপাত। কোনো কিছু বুঝে ওঠার বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আগেই বিকট শব্দে বজ্রাঘাত এসে পড়ে শফিকুলের ওপর। হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির পাশেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
শফিকুল ছিলেন তার পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। হাঁস পালন করে এবং হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তিনি সংসারের চাকা সচল রাখতেন। তার মৃত্যুতে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের অমানিশা।
এ বিষয়ে মেন্দিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হাকিম গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও দুঃখজনক। শফিকুল তার পরিবারের ভরসা ছিলেন। তার অকাল প্রস্থানে পরিবারটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা উপজেলা প্রশাসনকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছি।”
ঘটনার খবর পেয়ে নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন জানান, তিনি বর্তমানে দাপ্তরিক কাজে রানীচাপুরে অবস্থান করছেন, তবে কাজ শেষ করেই সাতগাঁও গ্রামে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেবেন।
অন্যদিকে, খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “এমন মৃত্যু সত্যিই খুব কষ্টের। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, নিহতের দাফন-কাফনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, কঠিন সময়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে শুকনো খাবারও পৌঁছে দেওয়া হবে।”
বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা হওয়ায় এবং বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার অভাবে বজ্রপাতে প্রাণহানির হার এখানে তুলনামূলক বেশি। এ অবস্থায় আবহাওয়া বৈরী বা আকাশ মেঘলা থাকলে হাওরে কাজ করতে না যাওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। নিতান্তই জরুরি প্রয়োজনে বের হলেও সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শফিকুলের মৃত্যু আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, প্রকৃতির খেয়ালের কাছে হাওরের খেটে খাওয়া মানুষগুলো আজও কতটা অসহায়। গোটা সাতগাঁও গ্রাম এখন শোকে স্তব্ধ, হাওরের বাতাসে যেন ভাসছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ।




