নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার দুর্গাপুরে আজ এক অন্যরকম সকালের সূচনা হলো। শিশু-কিশোরদের হাতে হাতে রঙের পেন্সিল, জলরং, তুলি আর ক্যানভাস। তাদের নিবিষ্ট চোখের দৃষ্টিতে পরম মমতায় ফুটে উঠছে ঝাঁকড়া চুল আর চশমা পরা সেই চিরচেনা বিদ্রোহী রূপ। এভাবেই রঙের আঁচড়ে আর শৈল্পিক আবহে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে হৃদয়ে ধারণ করছে দুর্গাপুরের নতুন প্রজন্ম।
কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অনন্য উদ্যোগ নিয়েছে দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসন। ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলা পর্যায়ে শুরু হয়েছে বর্ণাঢ্য ও বহুমাত্রিক এক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি পর্যায়ের শত শত শিক্ষার্থীর পদচারণায় এখন মুখর হয়ে উঠেছে স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনগুলো।
আগামী ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ছয় দিনব্যাপী চলবে প্রাণের এই উৎসব। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এটি কেবল পুরস্কার জয়ের কোনো গতানুগতিক প্রতিযোগিতাই নয়, এটি মূলত শিশু-কিশোরদের সাথে নজরুলের জীবনদর্শন ও সাহিত্যের সেতুবন্ধন তৈরির একটি মেলবন্ধন। কবিতা আবৃত্তি, নজরুলের গান, অভিনয় এবং চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেমন নিজেদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাচ্ছে, তেমনি পরিচিত হচ্ছে কবির সুবিশাল সাহিত্যভাণ্ডারের সাথে।

শিক্ষার্থীদের এমন শৈল্পিক প্রয়াসকে উৎসাহিত করতে এদিন অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গুণীজন ও শিক্ষাবিদরা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহমেদ সাদাত এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বজলুর রহমান আনছারীর উপস্থিতিতে আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। এছাড়াও উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগান প্রভাষক তোবারক হোসেন খোকন, লিপি দেবনাথ, তিথি সাহা, প্রধান শিক্ষক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, হীরেন দাস, খাদিজা আক্তার পাপড়ী, সহকারী শিক্ষক বিশ্বজিৎ সাহা, রক্তিম সরকার, মো. রফিকুল ইসলাম ও শাহীন বেগ প্রমুখ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা এক সুরে নজরুলের শ্বাশত আদর্শের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একটি নাম নয়, তিনি সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় কণ্ঠস্বর। তাঁর সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার যে বার্তা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজকের দিনেও প্রতিটি মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক। নতুন প্রজন্মের মননে মানবিক মূল্যবোধগুলো বুনে দিতে উপজেলা প্রশাসনের এই আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
দুর্গাপুরের এই আয়োজন প্রমাণ করে, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং নজরুলের মতো মহান ব্যক্তিত্বদের আদর্শ যদি সঠিক মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যায়, তবে তারাই একদিন বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলবে। তুলির আঁচড়ে আঁকা নজরুলের এই ছবিগুলোই যেন সেই আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনার গল্প বলছে।