সোমবার, অক্টোবর ১৯

সুন্দরবনের নদী-খাল পেরিয়ে লবণাক্ত চরাঞ্চলে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কেওড়া গাছ উপকূলের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের পরিচিত অংশ। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা এই গাছের টক স্বাদের ফল দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় মানুষের খাদ্য তালিকায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তবে এখন শুধু খাবার হিসেবে নয়, কেওড়া ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির সুযোগও দেখা দিয়েছে।

সুন্দরবনের কেওড়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ প্রজাতি। নতুন জেগে ওঠা লবণাক্ত ভূমিতে এ গাছ দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উপকূলীয় নতুন ভূমিতে ম্যানগ্রোভ বনায়নেও কেওড়ার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে কেওড়া ফল দিয়ে ডাল, মাছ ও বিভিন্ন রান্নায় টক স্বাদ আনা হয়। অনেক এলাকায় ফলটি দিয়ে আচার ও চাটনিও তৈরি করা হয়। কেওড়া ফলের জ্যাম, জেলি ও আচারসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত খাদ্য পণ্য তৈরির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কেওড়া ফল থেকে জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি করে সেগুলোর পুষ্টিমান ও উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পুষ্টিবিদ ডা. মোশাররফ হোসেন বাসস’কে জানান, কেওড়া ফলের প্রতি আগ্রহের অন্যতম কারণ এর পুষ্টি ও জৈব সক্রিয় উপাদান। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলটিতে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় কেওড়া ফলের বিভিন্ন অংশে পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও সালফারের মতো ম্যাক্রো-মিনারেল এবং আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক ও কপারের মতো মাইক্রো-মিনারেলের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

কেওড়া ফল ও এর তৈরি খাদ্য পণ্যে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সংশ্লিষ্ট উপাদানের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ফল থেকে পেকটিন ও ভিটামিন সি পৃথক করার সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে।

কেওড়া ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পুষ্টিমান নিয়েও গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় প্রতি ১শ’ গ্রাম কেওড়া ফলের পাল্পে প্রায় ৯৪২.৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই গবেষণায় জ্যাম, জেলি ও আচারে প্রক্রিয়াজাতকরণের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন সি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। তবে তাপ প্রয়োগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণে পরিবর্তন হতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে সুন্দরবনের বিভিন্ন ভোজ্য ফল নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় কেওড়া ফলে তুলনামূলকভাবে উচ্চমাত্রার মোট পলিফেনল এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতার তথ্য পাওয়া গেছে।

কেওড়া ফলের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হলো মৌসুমি ফলকে সারা বছর বাজারজাতযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা। তাজা ফলের সংরক্ষণকাল সীমিত হলেও আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলির মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা যায়।

গবেষণায় কেওড়া ফলের পেকটিন থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। পেকটিন খাদ্যশিল্পে জ্যাম ও জেলির মতো পণ্যের গঠন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে কেওড়া ফলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

উপকূলের নারী ও তরুণদের জন্য এ খাত বিশেষ সম্ভাবনাময় হতে পারে। মৌসুমে সংগৃহীত কেওড়া ফল স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করে বোতল বা প্যাকেটে বাজারজাত করা গেলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এর বিপণনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এক্ষেত্রে ঘরভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে শুরু করে সমবায়ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, ব্র্যান্ডিং, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং এবং অনলাইন ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে কেওড়ার মতো স্বল্প পরিচিত বনজ ফলও বিশেষায়িত বাজার তৈরি করতে পারে।
কেওড়ার গুরুত্ব শুধু মানুষের খাদ্য ও অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের বৈচিত্র্যের সঙ্গেও এ গাছের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেওড়া সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সমাজের একটি অগ্রগামী প্রজাতি এবং নতুন ভূমিতে উদ্ভিদ আচ্ছাদন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষণা ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণে কেওড়া ফলকে সুন্দরবনের বিভিন্ন বন্য প্রাণীর খাদ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কেওড়া ফল সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানুষের চাহিদা ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে গাছ ও বনভূমির ক্ষতি না করে ফল সংগ্রহের পদ্ধতিও নিশ্চিত করতে হবে।

বাগেরহাট পুর্ব সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বাসস’কে জানান, কেওড়াকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হলেও নির্বিচারে ফল সংগ্রহ বা গাছের ক্ষতি করে সম্পদ আহরণ করলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ পরিবেশে যেকোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগের সঙ্গে সংরক্ষণ নীতিকে সমন্বয় করা অপরিহার্য।

সাবেক ফরেস্টার আব্দুস সাত্তার জানান, সম্ভাবনাময় এ বনজ ফলকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হলে প্রথমে ফল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বা উদ্যোক্তা সহায়তা, মানসম্মত প্যাকেজিং এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা দরকার।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কেওড়াভিত্তিক ক্ষুদ্র খাদ্য শিল্প গড়ে উঠলে একদিকে যেমন বনজ সম্পদের মূল্য সংযোজন হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জন্য মৌসুমি আয়ের বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ঘরে বসে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে যুক্ত করার মাধ্যমে পারিবারিক আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

কেওড়ার আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো গবেষণাভিত্তিক ‘ফাংশনাল ফুড’ বা বিশেষ পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য পণ্য তৈরি। গবেষণায় কেওড়া ফল ও বীজে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় যৌগ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতার তথ্য পাওয়া গেলেও এসব উপাদানকে বাণিজ্যিক খাদ্য বা স্বাস্থ্য পণ্যে ব্যবহারের আগে আরও মানসম্মত গবেষণা, নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রয়োজন।

ফলে সুন্দরবনের কেওড়া এখন শুধু পরিচিত একটি টক ফলের নাম নয়; এটি হতে পারে উপকূলীয় মানুষের খাদ্য, পুষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উদ্যোগ, গবেষণার ফলকে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ, বাজার সংযোগ এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে টেকসই ব্যবস্থাপনা।
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের এ মডেল সফল করা গেলে সুন্দরবনের কেওড়া ফল একদিন উপকূলের ‘অবহেলিত বনজ সম্পদ’ থেকে পরিণত হতে পারে সম্ভাবনাময় স্থানীয় ব্র্যান্ড ও মূল্য সংযোজিত খাদ্যপণ্যের কাঁচামালে।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version