নিজস্ব প্রতিবেদক: মাত্র আটশো টাকার পুঁজি। সম্বল বলতে ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা। সেই সামান্য পুঁজি নিয়েই সাইকেলে করে কৃষকের দোরগোড়া থেকে ধান কিনে মোকামে বিক্রি শুরু করেছিলেন নেত্রকোনার এক তরুণ। সময়ের পরিক্রমায় দীর্ঘ ২৭ বছরের নিরলস পরিশ্রমে সেই ছোট ব্যবসা আজ মহিরুহে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে তিনি দুটি অত্যাধুনিক অটো রাইস মিলের মালিক, যেখান থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় শত টন চাল। এই অসামান্য সাফল্যের রূপকার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নের চাপুরী গ্রামের উদ্যোক্তা শহীদুল ইসলাম ফকীর ওরফে কামাল।

১৯৭৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর চাপুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কামাল। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পারিবারিক টানাপোড়েন ও দায়িত্বের চাপে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে জীবিকার তাগিদে নামতে হয় তাকে। সালটা ১৯৯৬। মাত্র চার মণ ধান, যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল আটশো টাকা, তাই নিয়েই শুরু করেন ধানের ব্যবসা। শুরুতে কৃষকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান কিনে সাইকেলে করে বিভিন্ন মোকামে নিয়ে বিক্রি করতেন। এরপর ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলে সাইকেলের বদলে রিকশা, ট্রলি এবং ট্রাকের ব্যবহার শুরু করেন।

শুধুই কাঁচা ধান কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকেননি কামাল। একসময় সিদ্ধান্ত নেন ধান প্রক্রিয়াজাত করে চাল উৎপাদনের। ছোট চাতাল দিয়ে শুরু হয় সেই নতুন পথচলা। লাভের টাকা পুনরায় বিনিয়োগ করে ধাপে ধাপে বাড়াতে থাকেন উৎপাদনক্ষমতা। অভিজ্ঞতার আলোকে ২০১৪ সালে তিনি স্থাপন করেন একটি সেমি-অটো রাইস মিল। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে গড়ে তোলেন পূর্ণাঙ্গ আধুনিক ‌‘ফকির অটো রাইস মিল’ এবং ‘সাইফা অটো রাইস মিল’।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটির দৈনিক চাল উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় শত টন। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান দুটি বড় ভূমিকা রাখছে। সেখানে বর্তমানে ৭০ জন স্থায়ী শ্রমিক কাজ করছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিকও রয়েছেন। উৎপাদন মৌসুমে আরও আনুমানিক তিনশো অস্থায়ী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। ধান-চাল পরিবহন, ওঠানামা ও সরবরাহের কাজে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন স্থানীয় বহু মানুষ।

কামালের দীর্ঘ সফলতার পথে তার পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে তিন ভাই জামাল উদ্দিন ফকীর, শফিকুল ইসলাম ফকীর ও রফিকুল ইসলাম ফকীর রকিকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। শুধু ব্যবসায়িক ঐক্যই নয়, তাদের পারিবারিক বন্ধনও বেশ দৃঢ়। চার ভাইয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ সদস্যের এক বিশাল যৌথ পরিবার আজও একসঙ্গে বসবাস করছে, যা বর্তমান সমাজে বেশ বিরল।

উদ্যোক্তা শহীদুল ইসলাম ফকীর কামালের মতে, সফলতার জন্য কেবল বিশাল পুঁজির প্রয়োজন নেই; বরং সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

মাত্র আটশো টাকা থেকে শত টন চাল উৎপাদনের অবিশ্বাস্য যাত্রা তাই শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, অধ্যবসায় ও পরিবারের ঐক্যের অনুপ্রেরণাদায়ী এক দৃষ্টান্ত।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version