নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন বিতরণ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব সহায়তা প্রদান করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা’ শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় কলমাকান্দা উপজেলা প্রশাসন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পীকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান আসিফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সম্প্রীতি ও সমঅধিকারের বার্তা দিয়ে বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ‘কে-হিন্দু, কে-মুসলমান, কে-বৌদ্ধ, কে-খ্রিষ্টান, কে-পাহাড়ি, কে-সমতল’ সবাইকে এক কাতারে এনেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল আমরা সবাই ‘বাংলাদেশ’। এই দেশ আমার মাতৃভূমি, এই দেশে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, অতএব পাহাড়ি বলে বা অন্য কোনো পরিচয়ে কাউকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার বা সুযোগ কম দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।”
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ‘অনগ্রসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, “আমি কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে ‘অনগ্রসর’ শব্দটি রাখতে চাই না। আমি তাদের অগ্রসর বা সমান রাখতে চাই। গারো, হাজং বা অন্যান্য আদিবাসী ভাই-বোনদের ডিকশনারি থেকে আমরা ‘অনগ্রসর’ শব্দটি মুছে ফেলতে চাই।”
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে ডেপুটি স্পীকার জানান, যাদের ঘর নেই, তাদের জন্য কলমাকান্দায় নয়টি এবং দুর্গাপুরে ১০টি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাহাড়ি জনগণের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বিশেষ টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছে। মন্দির ও গির্জা মেরামত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্ডার রোডের সাথে বাড়িঘরের সংযোগ স্থাপনের জন্য নতুন রাস্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং নদী ভাঙন রোধে প্রটেকশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাজং ভাষা সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “হাজংদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও বর্ণমালা বা নিজস্ব বই নেই। বাচ্চারা যেন তাদের মাতৃভাষা ভুলে না যায়, সেজন্য আমরা বই প্রকাশ করতে যাচ্ছি, যা প্রত্যেক হাজং বাড়িতে পৌঁছানো হবে। এছাড়া মন্দিরভিত্তিক হাজং ভাষা শিক্ষার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।”
মাদক থেকে সমাজকে রক্ষার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “মাদক থেকে সমাজকে রক্ষায় সচেতনতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি ধর্মই সৎ কাজকে উৎসাহিত করে এবং অসৎ কাজকে নিরুৎসাহিত করে।”
স্বনির্ভরতা অর্জনে জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আজকে যে সেলাই মেশিন দেওয়া হচ্ছে, তা বিক্রি করার জন্য নয়। এটি দিয়ে আপনারা নিজেদের এবং আশেপাশের মানুষের কাপড় সেলাই করে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। কাজ করে খেতে লজ্জার কিছু নেই।” বাইসাইকেল ব্যবহারের উপকারিতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাইকেল চালালে যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়ামও হয়, যা সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ডেপুটি স্পীকার বলেন, “এই উপবৃত্তির টাকা একটি উৎসাহস্বরূপ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এটি তোমাদের জন্য উপহার ও অনুপ্রেরণা। তোমরা ভালোভাবে পড়াশোনা করবে এবং ভালো রেজাল্ট করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ভালো ফলাফল অর্জন করে যারা বের হবে, তাদের চাকরির ক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা মতাদর্শিক ভেদাভেদ না দেখে তিনি নিজে সুপারিশ করবেন।
অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাঝে ব্যাপক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে দক্ষতা সম্পন্ন ৪২ জন শিক্ষার্থীর মাঝে বাইসাইকেল এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২৮ জন গরিব ও অসহায় মহিলার মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মাঝে নগদ উপবৃত্তি প্রদান করা হয়; যেখানে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণির ১৪১ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে তিন হাজার টাকা, ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির ৮৫ জনকে পাঁচ হাজার টাকা এবং একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ৫৭ জনকে সাত হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হয়। পাশাপাশি নয়টি পরিবারকে বসতঘর প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুখময় সরকারসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।



