শেখ শামীম: টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি এবং নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতবাড়ি। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও শিক্ষা কার্যক্রম। তবে প্রতি বছর একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে পলি জমে এলাকার প্রধান নদী ও খালগুলো তাদের নাব্যতা হারিয়েছে। বিশেষ করে গনেশ্বরী, সোমেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী, কংস ও মহাদেও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নদীগুলো পানি ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সামান্য অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি দুই কূল উপচে আশপাশের জনপদে ঢুকে পড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি করে।

খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘গনেশ্বরী, সোমেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী, মহাদেওসহ বেশ কয়েকটি নদীর তলদেশ পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বর্তমানে গজারমারি, লক্ষ্মীপুর, খাগড়া ও আশপাশের গ্রামের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

বন্যার পানির কারণে কলমাকান্দার শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সরেজমিনে গজারমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ ও শ্রেণিকক্ষে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। মাঠ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে এবং স্বাভাবিক পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের পাশ দিয়েই নদী প্রবাহিত হওয়ায় শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পানির স্রোত ও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইছেন না।

এ বিষয়ে গজারমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আফসানা তার শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, ‘বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় স্বাভাবিক পাঠদান কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও আমরা প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তাদের একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। ঘরবাড়ি, আয়ের উৎস ফসলি জমি এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নদী খনন ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ কখনোই চোখে পড়ে না।

একাধিক ভুক্তভোগী বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতি বছরই পানি আসে, আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। নদীগুলো সময়মতো খনন করা হলে হয়তো এত দ্রুত পানি গ্রামে ঢুকত না।’

তাদের দাবি, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যদি নদী ও খালগুলো পুনঃখনন করা হতো, তবে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা অনেকটাই বাড়ত এবং লোকালয়ে পানি ঢোকার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেত।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া, পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়া এবং নিয়মিত সংস্কার কার্যক্রমের অভাবই বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির মূল কারণ। প্রতি বছর কেবল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার পরিবর্তে নদীগুলোর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, খাল পুনঃখনন এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বর্ষা এলেই কলমাকান্দার মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র কখনোই বদলাবে না। দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version