দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিরোধ কার্যক্রমে কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে চিকিৎসার মূল কেন্দ্রে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান, পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক রোগতাত্ত্বিক নজরদারির সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অপরিহার্য।
প্রখ্যাত মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, ‘সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাই হলো প্রধান রক্ষাকবচ।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কমিউনিটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কেবল বর্তমান হামের পুনরুত্থানই ঠেকাবে না, বরং ভবিষ্যতে যেকোনো জনস্বাস্থ্য হুমকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ রোগ শাখার সাবেক লাইন ডিরেক্টর ড. বড়ুয়া বলেন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদেরই এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণই হবে মূল চাবিকাঠি।
চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিসি)’র সাবেক উপাচার্য ড. বড়ুয়া বলেন, ‘কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
তিনি তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী রোগতাত্ত্বিক নজরদারি চালানোরও পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ কর্মীদের মতো কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত, লক্ষণ পর্যবেক্ষণ এবং তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ ও রিয়েল-টাইম রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করছেন। একই সঙ্গে তারা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখছেন।
ড. বড়ুয়া বলেন, ‘কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, মাতৃকালীন অপুষ্টি, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং সঠিক শিশুখাদ্য অভ্যাসের অভাবের মতো কাঠামোগত সমস্যাও শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা
সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে।
ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও ও গ্যাভি’র সহায়তায় ৫ এপ্রিল থেকে ৩০টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় শুরু হওয়া এই কার্যক্রম ২০ এপ্রিলের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।
সংক্রমণের কারণ ও ঝুঁকি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, দেশের ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা।
তৎকালীন সরকারের সময়ে লকডাউন, সরবরাহ সংকট এবং টিকা নিয়ে দ্বিধার কারণে সে সময় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়।
শিশু রোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বেগম শরীফুন নাহার বলেন, ‘আমরা এখন সেই ঘাটতির ফল ভোগ করছি।’
তিনি জানান, এমনকি টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সের চেয়ে ছোট শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, একজন আক্রান্ত শিশু সর্বোচ্চ ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
লক্ষণ ও সতর্কতা
চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হওয়া। পরে কানের পেছন থেকে শুরু করে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
রোগ জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব কিংবা কানের সংক্রমণ হতে পারে। শ্বাসকষ্টকে বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান পরিস্থিতি
গত ৬ মে দেশে ১৫ লাখ ডোজ হাম-রুবেলা (এমআর) এবং ৯ লাখ ডোজ টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার নতুন চালান এসেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে টিকার কোনো সংকট হবে না।
তিনি বলেন, আগের সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে ইপিআই কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমান প্রশাসন এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত সম্ভাব্য হাম নিয়ে মোট ৩৩ হাজার ৬৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৭৪৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
তথ্যানুসারে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৬৫ জন এবং সন্দেহভাজন হামে ৩৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।



