মামলার জট দেশের আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টিতে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল জট নিরসনে সরকার ইতোমধ্যে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, এসব পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে হলে মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত হবে।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বাসস’কে জানান, প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামলা নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তার সক্রিয় উদ্যোগের ফলে দায়িত্ব নেওয়ার আড়াই মাসের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রায় ৪ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থায় গতি ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

তিনি আরও বলেন, আপিল বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে মামলার চাপ বাড়লেও প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় পুরাতন মামলাগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। একইভাবে নিম্ন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদেরও এজলাসের সময় সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মামলা জট নিরসনে যেসব পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন, সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই উপকৃত হবেন।

এদিকে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জানান, দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার। গৃহীত পদক্ষেপগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিচার বিলম্বের কারণ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার ব্যবস্থায় কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত—উভয় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিচারক সংখ্যা স্বল্পতা, আদালত কক্ষের সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সহায়ক জনবলের অভাব অন্যতম প্রধান সমস্যা। পাশাপাশি মামলার শুনানিতে বারবার মুলতবি, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্ত প্রতিবেদনের বিলম্ব এবং একাধিক স্তরের আপিল প্রক্রিয়াও বিচার বিলম্বের কারণ হিসেবে কাজ করছে।

মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইন সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে ‘দ্য কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এতে সমন জারির ক্ষেত্রে এসএমএস ও ভয়েস কল ব্যবহারের বিধান যুক্ত হয়েছে, যা প্রথাগত পদ্ধতির বিলম্ব কমাবে। এ ছাড়া অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিল, সরাসরি জেরা এবং ডিক্রি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এতে পলাতক আসামির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া পরিহার, ডিজিটাল সমন জারি এবং বিচার প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর আওতায় ইতোমধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সাক্ষ্য অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সাক্ষীদের আদালতে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কমছে এবং সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হচ্ছে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

মামলার জট কমাতে বিচারক ও আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৮৭১টি নতুন আদালত স্থাপন এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগে সহায়ক কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিচার কার্যক্রমে আরও গতি আনবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালতে মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে ২০টি জেলায় বাস্তবায়িত হয়ে ইতিবাচক ফলাফল দিচ্ছে। এতে মামলা দায়েরের হার কমছে এবং বিরোধ নিষ্পত্তির হার বাড়ছে।

আইনগত সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করতে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সেবা উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ‘১৬৬৯৯’ হটলাইনের মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিচার প্রাপ্তি সহজ করছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ২৩টি জেলায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় আদালত ভবন সম্প্রসারণ ও নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক হবে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, মামলা জটের একক কোনো কারণ নেই। আইনগত ত্রুটি, আপিলের চাপ এবং পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত ও মানবসম্পদের অভাব মিলিয়েই এই জট সৃষ্টি হয়েছে।

বিচারকদের জন্য স্টেনোগ্রাফার ও কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এতে বিচারকদের কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

হাবিবুর রহমান আরও বলেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও মানসম্মত কর্মপরিবেশ না থাকায় অনেক বিচারক তাদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছেন না। একাধিক বিচারককে একই এজলাস ভাগ করে কাজ করতে হওয়ায় সময়ের অপচয় হচ্ছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে, যার ফলে অনেকেই অনানুষ্ঠানিক সালিশ বা গ্রাম্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেজন্য সুফল পেতে সময় লাগবে। তবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, গতিশীল এবং জনগণবান্ধব হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version